Saturday, June 28, 2014

শ্মশ্রু পুরাণ



আমার চার বছরের শান্তিপূর্ণ (!) বিবাহিত জীবনে হঠাৎ করেই ঝড় নেমে এসেছে। ঘরে এখন টিকে থাকাই মুশকিল ভেবেছিলাম গরমের বন্ধে মজা করে আম কাঁঠাল খাব আর আয়াস করে বিশ্বকাপ ফুটবল দেখব। সারা রাত উল্লুকের মত জাগবো, আর দিনের বেলা শুধুই ঘুমকিন্তু, আমার গালে ইতস্তত গজিয়ে ওঠা দাড়ি যে সংসারে অশান্তির আগুন লাগাতে পারে তা কস্মিনকালেও ভাবিনি।
        এবার বিশ্ববিদ্যালয়ের গরমের বন্ধে দাড়ি রাখার প্ল্যান হঠাৎ আমার মাথায় ঢুকেছে, বিশেষ একটি কারণে। মানসিক প্রস্তুতিও শেষ। ভাল দিন দেখে 'রেজার'-কে তালাবন্ধ করে রেখেছিলাম। তিন-চার দিন ভালই চলছিল, কিন্তু বাঁধ সাধল পঞ্চম দিনে। আমার সহধর্মিনি আমাকে বারংবার প্রশ্ন করে অতিষ্ঠ করে তুলল। কেন শেভ করছি না, কিংবা কবে সেটা করব ইত্যাদি হাজারো প্রশ্নের বাউন্সার সামলাতে সামলাতে আমার অবস্থা সঙ্গিন। কাঁচা পাকা দাড়ি  শ্রীমুখের সৌন্দর্য কেড়ে নিয়েছে, গিন্নির এই বিশ্বাসে কিছুতেই ফাটল ধরানো গেল নাআয়নায় অবশ্য এই নূতন আমিকে দেখে আমার ভালোই লাগছিল, কিন্তু এটা বোঝাবো কাকে? দাড়ি রাখার নেপথ্য কারণ না বলে শুধু বললাম যে  বন্ধ যেদিন শেষ হবে, সেদিন আবার আগের মুখশ্রী ফিরে আসবে। স্বাভাবিকভাবেই এতে আগুনে ঘৃতাহুতি পড়ল। কারণ বলার জন্য আবার পীড়াপীড়ি। কিন্তু সেটা বলা আমার সমীচিন মনে হলনা। হঠাৎ মুখ দিয়ে বেরিয়ে এলো একটি বাক্য -'কারো ব্যক্তি স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করা উচিত নয়'ব্যস-তারপর আমার ইস্ত্রির মুখ দিয়ে কিছু সময়ের জন্য কথা বন্ধ। ঘর থেকে বেরিয়ে যাবার সময় তিনি শুধু একটি কথা বলে আমাকে চিন্তায় ফেলে দিলেন যা ভবিষ্যতের জন্য আমার পক্ষে কোনভাবেই শুভ মনে হলনা। 'ব্যক্তি স্বাধীনতাকে আশা করি তুমিও ভবিষ্যতে সম্মান করবে'- স্ত্রীর মুখসৃত এই বিদ্রূপাত্মক মন্তব্য আপাতত হজম করা ছাড়া আমার উপায় নেই। 
       নাটকের দ্বিতীয় অঙ্কে আমার মাতৃদেবীর প্রবেশ। আমার ভীমরতির কারণ অনুসন্ধানে তিনি ছুটে এসেছেন। বুঝতে পারলাম যে রান্নাঘরে আলোচনা শুরু হয়ে গেছে। এবার তো মহা মুশকিল। আমার মৌনতা মা-এর কাছে অস্বাভাবিক লাগছেতিনি সিদ্ধান্তে আসলেন যে আমার আমার নাকি কিসের নজর লেগেছে। ঘরে পূজো না দিলে আমার এথেকে রেহাই নেই। পুরোহিতের সঙ্গে অতিসত্ত্বর যোগাযোগের কথা বলে তিনি আবার রান্না ঘরে চলে গেলেন। এর মানে শান্তি স্বস্তয়নের জন্য পকেট থেকে আবার নগদ টাকা বেরিয়ে যাবে। যাই হোক ঘরে একজন প্রাণী অন্তত: খুশি, আর সে হল আমার তিন বছরের মেয়ে ঐশী। মাথার চুল যে গালে গজাতে পারে সেটা জেনে তার খুব আনন্দঐশী তো ওর মা-কে জিজ্ঞেস করেই ফেলল,'মা, তোমার মুখে তো বাবার মত চুল উঠছেনা!' এই কথা বলার পর আমি আর ঘরে না থেকে দ্রুত স্থানত্যাগ করলাম।
        প্রশ্ন শুধু ঘরেই সীমাবদ্ধ রইলনা। এবার দিবালোকেও প্রশ্ন ধেয়ে আসতে লাগলো বন্ধুবান্ধব আত্মীয় পরিজনদের কাছ থেকে। বাজার করতে বের হব হঠাৎ বাড়ির গেটেই দেখা বাড়ির মালিকের সঙ্গে। প্রশ্ন করার সঙ্গে সঙ্গেই মুখ দিয়ে বেরিয়ে এলো 'অব কি বার...'ঘোর বিজেপির সমর্থক-কে প্রিয় নেতার চেহারা মনে করিয়ে দিতেই তিনি ঘায়েল। 'সাধু সাধু' বলেই তিনি অন্দর মহলে চলে গেলেন। গলি থেকে বেরিয়ে শঙ্কর-দার সঙ্গে দেখা। সৌজন্যমূলক আলাপের পর সেই প্রশ্ন। আমার উত্তর-'বর্তমানে তো রেলের ভাড়াই শুধু বৃদ্ধি হল, আগামীতে ব্লেড আর রেজার ছাড় পেয়ে যাবে বলছেন?' কথাটি বলতেই বামপন্থী শঙ্কর-দার মুখের 'জিওগ্রাফি' মুহূর্তে বদলে গেল। তারপর পাক্কা দশ মিনিট শাসক দলের বদনাম শুনতে হল। কোনরকমে তাঁর কাছ থেকে ছাড়া পেয়ে বাজারের দিকে ছুটলাম। পান ক্রয় করেই আমার দৈনন্দিন বাজার শুরু হয়সেটারও এক সংক্ষিপ্ত ইতিহাস আছে, যা এ মুহূর্তে আর বলছিনা। 'দাদা কি বিশ্বকাপ ফুটবলে  ইরান দলের সমর্থক নাকি?' পান দোকানির এমন প্রশ্ন শুনেই মুহূর্তে আমার প্রতিক্রিয়া,'গভীর রাত্রিতে খেলা বোধহয় খুব একটা দেখা হয় না। আর্জেন্টিনা বলেও একটা টিম আছে।' সে খুব চিন্তায় পড়ে গেল। আর্জেন্টিনাতে কোনও খেলোয়াড় দাড়ি রাখে কিনা এই ব্যাপারে সে শিওর নয়। অস্ত্র কাজে লাগলো। এরপর এগিয়ে গেলাম মাছের বাজারের দিকে। সেখানেই আমার সদ্য বিবাহিত বন্ধু দীপঙ্করের সঙ্গে দেখা। আমার দিকে চেয়ে হেসে কিছু বলার আগেই বললাম,'চার বছর পর এর উত্তর পাবে। ওয়ারেন্টি পিরিয়ডের পরই তো শুরু হয় আসলো মজা। শুরুতে সব ঠিকঠাক চলে, তারপর...'দীপঙ্কর কথা না বাড়িয়ে কেটে পড়লো।
        মাছের দাম দিয়েই বাজারের বাজেট ঠিক হয়। তাই এবার সবজী কেনার পালা। গ্রামের ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে কম খরচে সবজি কিনতেই বাজারের শেষ সীমানায় এসে উপস্থিত হই।  আমার দরদাম করা বোধহয় বুড়ো সবজীওয়ালার পছন্দ হলনা। 'আরে ছোটে মিয়াঁ, গ্রাম ছেড়ে শহরে এসে কি ভুলে গেলে সবজী ক্ষেতে কি লোকসান হয়? ঘরে গিয়ে আব্বাজান কে জিজ্ঞেস করবে'অবাক হলাম, আমার দাড়ি তো ধর্ম বদলে দিল! কথা না বাড়িয়ে চটপট সবজী কিনে বেরিয়ে পড়লাম। রিক্সায় এসে নামলাম বাড়ির সামনে। কলেজে যাচ্ছে পাশের বাড়ির রোহিত। চোখের ইশারায় জিজ্ঞেস করল কি হয়েছে। বললাম 'নূতন ফ্যাশন'
        ঘরে ঢুকে অথিতিকে দেখে চক্ষু চড়ক গাছ। এখনও যে কি উত্তর দেব। আমার শাশুড়ি বসে আছেন। ভারিক্কি গলায় সেই অবধারিত প্রশ্ন আমার দিকে ধেয়ে আসল। 'আসলে সম্প্রতি চোখে কম দেখতে পাই', আমার এই উত্তরে তিনি বেশ অবাক হলেন। 'আসলে দাড়ি কাটলে চোখে এর সরাসরি প্রভাব পড়ে, তাই আপাতত কিছুদিন...'সন্তুষ্ট হলেন বলে মনে হলনা। ডাক্তারের নাম জিজ্ঞেস করলেন। শহরের বিখ্যাত এক চক্ষু বিশেষজ্ঞের নাম বলতেই তিনি জানালেন যে আগামী তিনদিন পর তিনিও সেখানে যাচ্ছেন চোখ দেখাতে।  আর যাচাই করে নেবেন এই আজব উত্তরের সত্যতা। যাই হোক কেটে পড়লাম সেখান থেকে। বিকেলে ঘরে এসে হাজির আমার সহকর্মীওকে বললাম যে শুধু ওকেই বলছি আসল সত্য। আমাদের ডিপার্টমেন্টে রয়েছে বুড়োর দল। তাই আমাদের মত কমবয়সীদের বিশেষ পাত্তা না পাওয়ার জন্য এই বুদ্ধি। সহকর্মীর মনে হয় খুব পছন্দ হল আমার কথা। সেই মুহূর্তে সেও ঠিক করল দাড়ি রাখবে। 'বিয়ে যখন করনি, তখন কোনও অসুবিধে নেই...'আমার অন্তর্নিহিত কথার মানে বোঝার আগেই চা মিষ্টি চলে এলো।
        সন্ধ্যাবেলা শ্বশুর বাড়িতে যেতেই শ্যালক-শ্যালিকা চেপে ধরল। বললাম বিশ্ববিদ্যালয়ে নাটক হতে চলেছে, আর এটাতে দেবদাসের ভূমিকায় আমি অভিনয় করতে চলেছি।  কিন্তু এসব বলে যে ওদের ঠকানো যাবেনা, সেটা বিলক্ষণ বুঝতে পারছি। বাবা রামদেব, বাবা রামকৃষ্ণ ছাড়াও পাগড়ি-হীন লাদেন ইত্যাদি অদ্ভুত সব নতুন নামকরণ হল আমার। দাড়ি রেখে যে এমন ল্যাজে গোবরে হতে হবে এটা কখনো ভাবিনি। আমার স্মার্ট চেহারাকে নাকি বর্তমানএ দাড়ি গিলে খেয়েছে, এটাই ওদের ধারণা। যাই হোক সত্য কথা তাহলে এতদিনে বের হল ওদের মুখ থেকে। কারণ শ্যালক-শ্যালিকাদের চোখে তো এতদিন আমি ছিলাম পৃথিবীর সবথেকে 'আনস্মার্ট ম্যান'!    
        আমার দাড়ি পোষে রাখার কিছু সুফল পেলাম। চারিদিকে আমার গুরুত্ব যেন একটু বেড়ে গেছে। সবাই যেচে এসে আলাপ করছে। ডিপ্লোম্যাসি উত্তর দিয়ে কিভাবে সমাজে চলতে হয় সেটাও সামান্য আয়ত্ব করলামমোটামুটি সবাইকে খুশি করতে পেরেছি একমাত্র সহধর্মিনি ছাড়া। ষ্টিম ইঞ্জিনের হুইসলের মত হঠাৎ গর্জনের আওয়াজ দু'দিন ধরে শুনতে পাচ্ছি। এভাবে চললে বিশ্বকাপ অন্তত শান্তিতে দেখা হবেনা।
        স্মার্ট ফোনের দিকে এগিয়ে গেলাম। তারপর 'সেলফাই ফটো'ফটো আপলোড করে ফেসবুকে স্ট্যাটাস আপডেট করলাম- 'হিমাদ্রি উইথ বিয়ার্ড...ফার্স্ট এন্ড লাস্ট'ফেসবুকের প্রোফাইল ফটোর জন্যই যত কাণ্ড। সুদীর্ঘ পনেরো দিনের কৃচ্ছসাধন আজ সম্পূর্ণ হল। কাল সকালেই হয়ে যাবো- 'শেভড জেন্টলম্যান'  সংসার হয়ে উঠবে সুন্দর আর শান্তিপূর্ণ।

- বরাকের নুতন দিগন্ত পত্রিকায় প্রকাশিত (২৬ জুন, ২০১৪ ইং)

Friday, June 28, 2013

সূর্যের নিকটবর্তী নক্ষত্রে তিনটি 'সুপার পৃথিবী' আবিষ্কৃত






প্রাণের স্পন্দন থাকবে তো?
বিজ্ঞান সাময়িকী 'এস্ট্রোনমি অ্যান্ড এস্ট্রোফিজিক্স'-এ গবেষণা পত্রটি প্রকাশিত হবার পর মহাকাশ বিজ্ঞানীদের মস্তিষ্কে ঘুরপাক খাচ্ছে শুধু এই প্রশ্নটিই সম্প্রতি সূর্য থেকে প্রায় ২২ আলোকবর্ষ (২০৭ ট্রিলিয়ন কিলোমিটার) দূরে 'গ্লিসে ৬৬৭ সি' নামক নক্ষত্রে পৃথিবীর মত তিনটি বসবাস যোগ্য গ্রহ আবিষ্কৃত হয়েছে এই গ্রহ তিনটিতে জল থাকার সম্ভাবনা প্রবল আর জল থাকলেই প্রাণ ...
এই বিশাল মহাবিশ্বে শুধু পৃথিবী নামক একটি ক্ষুদ্র গ্রহে প্রাণের অস্তিত্ব থাকবে সেটা কখনোই মেনে নেওয়া যায়না! অগণিত নক্ষত্র খচিত রাতের আকাশে তাকালেই নানা প্রশ্ন মনের জানালায় উঁকি দেয় এই মহাবিশ্বে কি আমরা একা? সৌরজগতের বাইরে কি কোনও গ্রহে প্রাণের অস্তিত্ব থাকতে পারে না? যদি ভিনগ্রহী মানুষ থেকে থাকে, তবে কি অতীতে তাদের পদার্পণ ঘটেছিল এই গ্রহে? বহির্বিশ্বের উন্নত প্রাণীদের সঙ্গে যোগাযোগ করা কি সম্ভব হবে? প্রশ্নগুলির উত্তরের সন্ধানে বিজ্ঞানীরা তাঁদের গবেষণা অব্যাহত রেখেছেন, কিন্তু এর উত্তর আমাদের কাছে আজও অধরা উত্তর না মিললেও কল্পনার জগতে কিন্তু আমরা রচনা করে চলেছি নিত্য নূতন সৃষ্টি উপন্যাস, গল্পে তাই আবির্ভাব ঘটেছে ভিনগ্রহী মানুষ বা 'এলিয়েন'-দের যারা নাকি মানব সভ্যতা থেকেও উন্নত আর্থার সি ক্লার্ক, কলিন হার্ভে, উইলিয়াম হিগস্মিথ ইত্যাদি কল্পবিজ্ঞান খ্যাত লেখকদের কলম থেকে সৃষ্টি হল রোমহর্ষ কারি অবিশ্বাস্য গল্প সাহিত্যের অঙ্গন থেকে ধীরে ধীরে তাঁদের ঠাই হতে লাগলো সেলুলয়েডের পর্দায় হলিউডের ম্যাজিক স্পর্শে 'ই টি', 'সুপারম্যান', 'ম্যান ইন ব্ল্যাক' ইত্যাদি মুভি বিশ্বের বাজার দাপিয়ে বেড়াতে লাগল পিছিয়ে নেই বলিউড...'কোই মিল গয়া' মুভিটিও সবার হৃদয় স্পর্শ করল
দূরবীক্ষণ যন্ত্রের আবিষ্কার রাতের রহস্যভরা আকাশকে নিয়ে এলো কাছে ধীরে ধীরে মহাবিশ্বের রহস্য আমাদের কাছে পরিষ্কার হতে লাগল কিন্তু সৌরজগতের বাইরে কোনও নক্ষত্রে গ্রহের উপস্থিতি পরীক্ষামূলক ভাবে প্রমাণ করা যাচ্ছিলো না আর এর মূল কারণ হচ্ছে দূরত্ব আসলে নক্ষত্রের আলোতেই আলোকিত হয়ে ওঠে গ্রহ আর দূরত্ব বাড়লে অতি শক্তিশালী দূরবীন দিয়ে পৃথিবী থেকে দূরবর্তী গ্রহকে চিহ্নিত করা মুশকিল তখন পরোক্ষ উপায়ের উপর নির্ভর করা ছাড়া উপায় থাকেনা বিজ্ঞানীরা উন্নত প্রযুক্তির সাহায্যে ১৯৮৮ সালে প্রথম সৌরজগতের বাইরে গ্রহের সন্ধান পান শুরু হয় এক নতুন অধ্যায় বাকিটা ইতিহাস সৌরজগতের বাইরে নূতন গ্রহের অস্তিত্ব জানার তাগিদেই 'কেপলার'-এর জন্ম এখন পর্যন্ত ১৩২টি গ্রহ আবিষ্কারের কৃতিত্ব তার ঝুলিতে ওহ! বলতেই ভুলে গেছি, 'কেপলার' আসলে কোনও মানুষ নয়, সে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ সংস্থা 'নাসা' প্রেরিত একটি মহাকাশযান, যার মধ্যে রয়েছে অত্যাধুনিক দূরবীক্ষণ যন্ত্র এছাড়াও রয়েছে নানা সূক্ষ্ম যন্ত্রাদি জার্মানির বিখ্যাত জ্যোতির্বিজ্ঞানী জোহানেস কেপলারের নামানুসারেই তার এই নাম, যাকে গত ৭ মার্চ ২০০৯ সালে পৃথিবী থেকে প্রেরণ করা হয়েছিল তারপর থেকেই তার জয়যাত্রা অব্যাহত কেপলার বেঁচে থাকলে এই আবিষ্কারের খবরটা পেয়ে উল্লাসে তিনি মেতে উঠতেন সন্দেহ নেই! প্রতি মাসেই নিত্যনুতন গ্রহের খবর কেপলার আমাদের উপহার দিচ্ছে আর নূতন গ্রহ আবিষ্কার হলেই আমাদের মনে সেই চিরাচরিত প্রশ্ন জাগে-'প্রাণ আছে তো গ্রহটিতে'?
বিজ্ঞানের তত্ব মতে জল বিনা কোনও প্রাণ টিকে থাকতে পারেনা তাই কোনও গ্রহে প্রাণ থাকতে হলে তরল জল থাকা আবশ্যক গ্রহে জল থাকবে কিনা তা নির্ভর করে নক্ষত্র থেকে সেই গ্রহের দূরত্বের উপর কারণ জল তরল থাকতে গেলে তাপমাত্রা অবশ্যই শূন্য ডিগ্রী সেলসিয়াস থেকে একশো ডিগ্রীর ভেতরে হতে হবে আমাদের এই সৌরজগতের খুব কাছের গ্রহ বুধ আর শুক্র সূর্যের খুব কাছে থাকার জন্য জল বাষ্পীভূত হয়ে যায় আর পৃথিবীর পরে যে গ্রহগুলি রয়েছে যেমন মঙ্গল, বৃহস্পতি, শনি ইত্যাদি গ্রহে তাপমাত্রা শূন্য ডিগ্রী থেকে কম হওয়ায় সেখানেও জল তরল অবস্থায় থাকতে পারেনা সূর্য থেকে প্রায় পনেরো কোটি কিলোমিটার দূরত্বে জল তরল অবস্থায় থাকতে পারে আর আমাদের পৃথিবী রয়েছে তেমন দূরত্বে যে বলয়ের মধ্যে জল তরল অবস্থায় থাকতে পারে তাকে 'হেবিটেবল জোন' বা 'বসবাস যোগ্য বলয়' বলা হয় বলা-বাহুল্য যে এই সৌরজগতে শুধু পৃথিবীই এই বলয়ের মধ্যে রয়েছে, তাই প্রাণের বিকাশ সম্ভব হয়েছে এই গ্রহে নক্ষত্রের ভর বেশি হলে সেই বলয়ের দূরত্বও বাড়তে থাকে, আর কম হলে দূরত্ব কমতে থাকে      
সম্প্রতি সূর্যের নিকটবর্তী নক্ষত্র 'গ্লিসে ৬৬৭ সি'-তে ছয়টি গ্রহ আবিষ্কৃত হয়েছে এই গ্রহগুলির মধ্যে তিনটি রয়েছে বসবাস যোগ্য বলয়ে আমাদের প্রিয় নক্ষত্র সূর্য ঐ নক্ষত্র থেকে প্রায় তিনগুণ বড় হলেও গ্রহ তিনটি পৃথিবী থেকে কিন্তু সামান্য বড় প্রাথমিক গবেষণায় দেখা গেছে যে এদের ভর পৃথিবী থেকে প্রায় তিন থেকে চার গুণ বড় হবে বসবাস যোগ্য বলয়ে থাকার সুবাদে গ্রহ গুলিতে জল থাকার সম্ভাবনা প্রবল আর জল থাকলে প্রাণের সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায়না কেপলারের এই আবিষ্কারে নাসার বিজ্ঞানীরা উল্লসিত এ যেন প্রত্যাশা থেকেও অনেক বেশি! বিজ্ঞানীদের পরবর্তী কাজ হবে ঐ গ্রহগুলির গঠন প্রকৃতি আর বায়ুমণ্ডল নিয়ে অধ্যয়ন এছাড়া ঐ গ্রহগুলিতে রেডিও তরঙ্গ প্রেরণ করেও উন্নত প্রাণী আছে কি না এও সন্ধান করা যাবে আসলে কেপলারের নিত্যনুতন আবিষ্কার বিজ্ঞানীদের পাশাপাশি সাধারণ মানুষদেরও বহির্বিশ্ব নিয়ে আগ্রহ বাড়াচ্ছে হয়তো সেই দিন আর দূরে নেই যখন বহির্বিশ্বের কোনও গ্রহে এলিয়েনদের সন্ধান আমরা পেয়ে যা
কেপলারের এই সাফল্যে নাসার বিজ্ঞানী জন গ্রুনসফেল্ড তো আবেগে বলেই ফেললেন-'কেপলার মহাকাশযান তো বিজ্ঞানের রকস্টার হয়ে উঠল' আপনারা কি বলেন?
- যুগশঙ্খ পত্রিকাতে প্রকাশিত (২৮ জুন, ২০১৩)