Wednesday, July 27, 2011

‘হ্যাকিং’ – ছায়া-যুদ্ধের এক নুতন নাম




থ্যাঙ্ক্‌ ইউ এন্ড গুডবাই
অপ্রত্যাশিত শব্দাঘাত ! ১০শে জুলাইর ঝলমলে সকালে এক সাপ্তাহিক সংবাদপত্রের প্রচ্ছদের কিছু শব্দ হৃদয় কাঁপিয়ে তুলল ব্রিটেনের ২৬ লক্ষ পাঠকদের । তাদের প্রিয় পত্রিকা নিউজ অফ দ্য ওয়ার্ল্ড আর আগামীতে প্রকাশিত হবেনা ।
বয়স ? ১৬৮ বছর ! 
সেই ১ অক্টোবর ১৮৪৩ সাল থেকে তার যাত্রা শুরু হয়েছিল । সুদীর্ঘ ১৬৮ বছরে  ব্রিটেনের নানা চমকপ্রদ তথ্য ছাড়াও সেখানের সেলিব্রেটি, রাজপরিবারের নানা কেচ্ছা কাহিনীর সাতকাহন বর্ণনা করে সে জনপ্রিয়তার তুঙ্গে পৌঁছে গিয়েছিল । বিশ্বের সর্ববৃহৎ পাঠক-সমৃদ্ধ ইংরেজি পত্রিকাটির হঠাৎ এই ছন্দপতন তাই অনেকেই মেনে নিতে পারছেন না । পত্রিকাটিকে পাঠক সমাজের কাছে আকর্ষণীয় করার জন্য পত্রিকাগোষ্টী সেলিব্রেটিদের ফোনে আড়িপাতার মত অসদুপায় অবলম্বন করে । সম্প্রতি পত্রিকাগোষ্টীর বিরুদ্ধে সরকারের পক্ষ থেকে গুরুতর অভিযোগ প্রমাণ সহ নিয়ে আসা হয় । তাই এত জনপ্রিয়তার মধ্যেও পত্রিকাটিকে অবশেষে অবসরের পথে যেতে হয়েছে । ফোন হ্যাকিং কেলেঙ্কারির অভিযোগ নিয়ে সারা ব্রিটেন এখন তোলপাড় !  হয়ে গেছে নানা নাটক !
নাটকের নেপথ্যে রয়েছে হ্যাকিং এর কালো ছায়া । যার বিষাক্ত নিঃশ্বাসে সারা বিশ্বে ছায়া-যুদ্ধের আবহ তৈরি হয়ে গেছে । আজ কোন দেশই এর আওতা থেকে মুক্ত নয় । নুতন এই দৈত্যের বাড়বাড়ন্ত ভাবিয়ে তুলেছে সবাইকে ।  আসলে বর্তমান দুনিয়ায় চোরের চুরি করার ধরণও বদলেছে । তথ্য প্রযুক্তির সাহায্য নিয়ে চুরি করাকেই সোজাসাপটা ভাষায় হ্যাকিং বলা হয় । আর এই কর্মের সঙ্গে যারা যুক্ত থাকেন তাদের বলা হয় হ্যাকার।এই হ্যাকিং আবার জন্ম দিয়েছে সাইবার টেরোরিস্‌ম্‌কে । হাজার ক্রোশ দূরে থেকেও আক্রমণ করবার নুতন এই পদ্ধতি কালো জগতের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের কাছে খুব জনপ্রিয়তা লাভ করেছে । হ্যাকিংয়ের সাধনায় মত্ত কিছু দুষ্ট ব্যক্তির মদমত্ততায় কেঁপে উঠেছে বিশ্ব ।  


 
প্রাথমিক পর্যায়ে ব্যক্তিগত স্বার্থসিদ্ধির জন্য হ্যাকিংকে ব্যবহার করা হত । কোন ব্যক্তির অজান্তে তার বিস্তারিত তথ্য জেনে হ্যাকাররা তাকে নানাভাবে উত্যক্ত করার পাশাপাশি আর্থিকভাবে লাভবান হবার চেষ্টা করতো । ঠিক সেই ভাবে নিউজ অফ দ্য ওয়ার্ল্ড এর সাংবাদিকেরা ফোন হ্যাকিং এর সাহায্যে সেলিব্রেটিদের ফোনে আড়ি পেতে জম্পেশ রিপোর্ট পরিবেশন করে পত্রিকাটিকে জনপ্রিয় করার মত অপরাধ করেছে । কিছু পুলিশ কর্মীর পরোক্ষ মদতে পত্রিকাগোষ্টী অনেকদিন ধরেই এই হ্যাকিং চালিয়ে যাচ্ছিল । অবশেষে সরকারের তরফ থেকে কঠিন অবস্থান নেওয়ায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এসেছে । বর্তমান ইন্টারনেটের যুগে তথ্য চুরির অভিযোগ বাড়ছে । মূলত: আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোই সবচেয়ে ক্ষতির সম্মুখীন হয় । কখনো ব্যক্তিগত উদ্যোগে আর কখনো সমষ্টিগতভাবে নানা ওয়েবসাইট আক্রমণ করা হয় । কারণ ? ধ্বংসের ম্যাপ তৈরি করা ।
     মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আর রাশিয়ার ঠাণ্ডা যুদ্ধের ছায়া যেন আবার ফিরে এসেছে । এবার আর সম্মুখ সমরে যুদ্ধ নয়, ইন্টারনেটের বিশাল সাম্রাজ্য সাইবার জগতে শুরু হয়েছে ঠাণ্ডা লড়াই । হ্যাকিংয়ের আঘাতে বিশ্বের জর্জরিত দেশগুলি মুক্তিলাভের উপায় খুঁজছে । আসলে হ্যাকিং এখন শুধু আর আতঙ্কবাদীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে এখন নানা রাষ্ট্রপ্রধানদের অন্দরমহলে ঢুকে পড়েছে । হ্যাকিংকে হাতিয়ার করে এক অঘোষিত যুদ্ধও ঘোষণা হয়ে গেছে । কিছু কিছু দেশের বিরুদ্ধে তাই উঠেছে ইন্টারনেটে তথ্য চুরির অভিযোগ ।
     সম্প্রতি হ্যাকিং নিয়ে চীন-মার্কিন সম্পর্ক উত্তপ্ত হয়েছে । সাইবার জগতের সর্ববৃহৎ সার্চ ইঞ্জিন গুগল চীনের বিরুদ্ধে তথ্য চুরির অভিযোগ নিয়ে এসেছে । বিশ্বের কোনায় কোনায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে গুগলের ই-মেল সার্ভিস জি মেল-এর ব্যবহারকারীরা । এই বৃহৎ মার্কিন কোম্পানির অভিযোগ চীনে তাদের ই-মেল সার্ভিসের কয়েক হাজার গ্রাহক  হ্যাকিংয়ের শিকার হয়েছেন। তাদের মধ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা ছাড়াও রয়েছেন সরকারি, সেনাবাহিনীর কর্মকর্তা এবং সাংবাদিক মহল । অবশ্য চীন বরাবরের মতই হ্যাকিং নিয়ে তাদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ ভিত্তিহীন বলেছে । মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা এফ বি আই এরই মধ্যে অনুসন্ধানে নেমে পড়েছে । চীনা হ্যাকিংয়ের রেশ মিটতে না মিটতেই আবার হ্যাকিংয়ের শিকার হয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র । সেখানের প্রতিরক্ষা দফতর পেন্টাগন-এ ভয়াবহ সাইবার আক্রমণ চালানো হয়েছে । পেন্টাগনের কম্পিউটার থেকে প্রায় চব্বিশ হাজার নথি চুরি হয়ে গেছে । অনেক স্পর্শকাতর তথ্যও হ্যাকাররা গায়েব করে দিয়েছে । মার্কিন উপ-প্রতিরক্ষামন্ত্রী উইলিয়াম লিন এই ঘটনাকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে সর্ববৃহৎ সাইবার হামলা হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন । 


     ভারতেও ওয়েবসাইট শিকারের নানা ঘটনা সামনে এসেছে । মূলত: পাকিস্তান আর চীনের হ্যাকারদের তরফ থেকেই আক্রমণের খবর সবচেয়ে বেশী। ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা সি বি আই-এর ওয়েবসাইটকে হ্যাকিং করে রীতিমত হইচই ফেলে দিয়েছিল হ্যাকাররা । এছাড়া নানা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ওয়েবসাইটও হ্যাকারদের আক্রমণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে । অনেক গ্রাহকের অনলাইন ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট থেকেও টাকা হাপিশ হয়ে যাবার নজিরও রয়েছে । ভারতের তরফ থেকে ওয়েবসাইটকে সুরক্ষা করার জন্য নানা প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে । কিন্তু হ্যাকাররাও নিত্যনুতন কৌশল উদ্ভাবন করে ওয়েবসাইটের সিকিউরিটিকে বিধ্বস্ত করার কাজ করেই যাচ্ছে ।  
     মজার একটি ঘটনা বলেই ইতি টানবো নিবন্ধের ।  গত মাসে লুলজ সিকিউরিটি নামে একটি হ্যাকার গ্রুপ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা সি আই এ, বহুজাতিক কোম্পানি সোনি, ব্রিটিশ পুলিশের ওয়েবসাইট ইত্যাদি হ্যাকিং করে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে । তাদের আক্রমণে বিশ্বের বৃহৎ বৃহৎ কোম্পানি আর সরকারি ওয়েবসাইটগুলো মুখ থবড়ে পড়ে । সাইবার জগতে রীতিমত চ্যালেঞ্জ জানিয়ে পরিকল্পিত পঞ্চাশ দিনব্যাপী হ্যাকিংয়ের পর তারা অভিযানের সমাপ্তি টেনেছে ।  এখনো লুলজের বিস্তারিত খবর তেমনভাবে জানা যায়নি ।  তবে ধারণা করা হচ্ছে লুলজ বেনামি হ্যাকারদের একটি দল ।
     হ্যাকারদের প্রতিরোধের জন্য ইতিমধ্যে নানা দেশে গড়ে উঠেছে অ্যান্টি-হ্যাকারদের দল । যারা রীতিমত লড়াই করছে সাইবার জগতে । তাদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় হয়তো হ্যাকারদের নির্মূল করা সম্ভব হবে । ওয়েবসাইটের সুরক্ষা আরো মজবুত হচ্ছে । সাইবার অপরাধে নানা আইনও বলবত হচ্ছে দেশে দেশে । সেদিন বোধহয় আর দূরে নেই যখন হ্যাকিংয়ের অন্তর্জলী যাত্রা হবে । তখন অ্যান্টি-হ্যাকারদের অবশ্যই বলবো  থ্যাঙ্ক্‌ ইউ আর হ্যাকারদের - গুডবাই

Friday, June 17, 2011

মশা মারতে আর কামান দাগাতে হবেনা



দুনিয়ার সবথেকে ভয়ঙ্কর জীব সে ! প্রতি বছর বিশ্বের প্রায় কুড়ি লক্ষ মানুষ তার জন্য প্রাণ হারায় । লক্ষ কোটি টাকা খরচ হয় তার নিধনে । কিন্তু তবুও তাকে দমানো যায় না, যেন রক্তবীজের বংশ ! তার নিষ্ঠুর গান আমাদের কর্ণরন্ধ্রে প্রবেশ করলে হাত দু’টি চঞ্চল হয়ে উঠে তাকে পিষে মারার জন্য ! কারণ তার মারাত্মক ছোবলের ফলে সংক্রামিত হতে পারে ম্যালেরিয়া, ডেঙ্গু জ্বর নামক ভয়ানক রোগ । পাঠকেরা নিশ্চয় এতক্ষণে অনুধাবন করতে পেরেছেন সেই সেলিব্রেটি ভিলেনের নাম ! ‘মশা বাবাজী’-কে নিয়ে সাতকাহন লেখার আগে একটি সুখবর জানিয়ে দেই । আমেরিকার প্রবাসী বাঙালি বিজ্ঞানী আনন্দশঙ্কর রায় মশাদের বোকা বানাবার এক অনন্য উপায় খুঁজে পেয়েছেন যা নিয়ে রীতিমত হৈ চৈ পড়ে গেছে বিজ্ঞানী মহলে ।   
     ভয়ানক জীবের লিস্টে মশার নাম সবার উপরে । আর তার ঠিক পরেই রয়েছে এশিয়ান কোবরা সাপ । ভাবতেই অবাক লাগে যে সাপের থেকেও ভয়ানক হচ্ছে মশক ! সমীক্ষায় দেখা গেছে সাপের কামড় থেকেও বেশী মানুষের মৃত্যু হয় মশার কামড়ে । আর সেই মশার হাত থেকে বাঁচবার জন্য নানা উপায় বা পদ্ধতি মানুষ অনেকদিন ধরেই ব্যবহার করে আসছে ।  মশাকে নির্মূল করার জন্য নানা কীটনাশক বা ঔষধ ব্যবহার করা হয় । কিন্তু অদ্ভুত উপায়ে মশা সেই সব বাধা অতিক্রম করে আবার প্রাণবন্ত হয়ে উঠে । আর তার শুঁড়ের ছোবলে অতিষ্ঠ হয়ে উঠে জনজীবন ।
     আমেরিকার ক্যালিফোর্নিয়া-রিভারসাইড বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানী আনন্দশঙ্কর রায় এবং তাঁর সহযোগীরা মশা নিয়ে গবেষণার পর দেখেছেন যে গন্ধ পেলেই মানুষকে ছেঁকে ধরে মশারা । মশার শুঁড়ে ‘ম্যাক্সিলারি পাল্পস’ নামে এক প্রত্যঙ্গের উপস্থিতির জন্যই এই গন্ধের খোঁজ পায় মশারা । বিজ্ঞানী রায় মশাদের বোকা বানাবার জন্য এক দারুণ উপায় বের করেছেন । তাদের গবেষণার বিস্তারিত তথ্য বিখ্যাত ‘নেচার’ জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে ।  আনন্দশঙ্কর এবং তাঁর সহযোগীরা এমন রাসায়নিক মিশ্রণ বানিয়েছেন যা দিয়ে মশার ঘ্রাণেন্দ্রিয়কে বোকা বানানো যেতে পারে । মশা তখন আর খুঁজে পাবেনা মানুষকে । এই মিশ্রণ ব্যবহার করে ভবিষ্যতে বানানো যেতে পারে নানা ‘লোশন’ আর ‘স্প্রে’ ।
     ‘এই পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াহীন রাসায়নিক মিশ্রণ ব্যবহার করে মশাকে মানুষের সান্নিধ্য থেকে দূরে রাখা সম্ভব । আর এর আবিষ্কার ভবিষ্যতে কীটপতঙ্গ নাশকতার ক্ষেত্রে এক অনন্য অবদান রাখবে’ – বললেন প্রবাসী বিজ্ঞানী আনন্দশঙ্কর রায় । নিঃসন্দেহে এই আবিষ্কার লক্ষ লক্ষ মানুষকে ম্যালেরিয়া, ডেঙ্গু, ‘ইয়েলো ফীভার’ ইত্যাদির করাল আক্রমণ থেকে অব্যাহতি দেবে । আর এর জন্য বৈজ্ঞানিক মহলে বিজ্ঞানী রায়ের কদর অনেক বেড়ে গেছে ।
     মশা নিজের চরিত্র রাজনৈতিক নেতার মতই খুব তাড়াতাড়ি বদল করতে পারে । মশা নাশকারী ‘কয়েল’ কিংবা ‘লিকুয়িডেটর’ ব্যবহার করে এখনো পর্যন্ত মশার আক্রমণ থেকে সম্পূর্ণভাবে মুক্তি পাওয়া যায়নি । বিবর্তনের ফলে হয়তো আবারও মশা খোল পালটে নুতনভাবে আক্রমণের পথ আবিষ্কার করবে । আসলে রক্ত পিপাসীদের রক্তের স্বাদ ছাড়া যে আর কিছুই ভাল লাগেনা ! তবে বিজ্ঞানী রায় আর তার সহযোগীরা যে ভাবে মশাকে আক্রমণ করেছেন তার ফলে আপাতত মশার তরফ থেকে পালটা আক্রমণের সম্ভাবনা খুবই কম ।    
     মশার অসহ্য কামড় সহ্য করে প্রবন্ধখানি লেখার চেষ্টা করছি । মশাদেরও বোধহয় ইচ্ছে নেই এই বিষয়ে প্রবন্ধ লেখা হোক ।

Thursday, June 16, 2011

সৌর সুনামি: আশঙ্কায় বিজ্ঞানীমহল




ঘটনাটি যে ঘটবে বিজ্ঞানীরা তা আগেই জানতেন । কিন্তু অপেক্ষা ছিল সেই মাহেন্দ্রক্ষণের ! ৭ জুন ভারতীয় সময় দুপুর বারোটা এগারো মিনিটে এলো সেই সময় যখন সূর্য বাবাজি সজোরে হাঁচি দিলেন । সুদীর্ঘ পাঁচ বছর পর আবার তাঁর এই ব্যামো ফিরে এসেছে । আর সূর্যের সাময়িক এই রোগ হলে পৃথিবী বাসিদেরও যে নানা অশান্তির সম্মুখীন হতে হয় তা অতীতের কিছু ঘটনা থেকেই পরিস্কার ।  
    পৃথিবীর সবথেকে কাছের নক্ষত্র সূর্য আমাদের সব শক্তির উৎস । সূর্যের অন্দরে পরমাণুর প্রতিনিয়ত বিক্রিয়ার ফলে সৃষ্টি হচ্ছে অফুরন্ত শক্তি । প্রায় পনেরো কোটি কিলোমিটার দূরত্ব অতিক্রম করে বিকিরণের মাধ্যমে মাত্র ৮.৩ মিনিটে সূর্য থেকে সেই ভাণ্ডার পৃথিবীতে চলে আসে । পাশাপাশি ক্ষতিকারক রশ্মিও পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে এসে পৌছায়, কিন্তু ওজোনস্তরের উপস্থিতির জন্য সেগুলো পৃথিবীতে পৌছাতে পারেনা । এ ছাড়া পৃথিবীর নিজস্ব চৌম্বকক্ষেত্রও এক্ষেত্রে বর্মের মত কাজ করে । তাই সভ্যতার শুরুয়াত থেকেই জীবজগত সূর্যের ক্ষতিকারক রশ্মি থেকে সুরক্ষিত আছে । কিন্তু কখনো কখনো সূর্যের সরবরাহকৃত শক্তির যোগান হঠাৎ বেড়ে যায়, আর তখনই হয় বিপত্তি । বিজ্ঞানীরা এর নাম দিয়েছেন ‘সৌরঝড়’ । তবে এই ঝড় একটি নির্দিষ্ট সময় পরপর হয় ।
    সূর্যের উপর নজরদারি করার জন্য মহাকাশ বিজ্ঞানীরা নানা কৃত্রিম উপগ্রহ মহাকাশে প্রেরণ করেছেন । সেই মহাকাশযানগুলো থেকে পাঠানো তথ্য সমৃদ্ধ করেছে সৌরবিজ্ঞানকে । সৌরজগতের সবথেকে কাছের নক্ষত্র হল-প্রক্সিমা সেন্টরাই। সূর্য থেকে এর গড় দূরত্ব হল প্রায় ৪.২ আলোকবর্ষ (এক আলোকবর্ষ = ৯৫০০০০ কোটি কিলোমিটার)। এত দূরত্বে তার এই অবস্থানের জন্য পৃথিবী থেকে শক্তিশালী দূরবীক্ষণ যন্ত্রের সাহায্যেও তাকে বৃহদাকারে দেখা সম্ভব হয় না । তাই আমাদের সবথেকে কাছের তারা সূর্যের জন্মবৃত্তান্ত অধ্যয়ন করলেই জানা যাবে দূরবর্তী নক্ষত্র সম্বন্ধে নানা অজানা তথ্য । দূরবীক্ষণ যন্ত্রের সাহায্যে সূর্যকে পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায় তার গাত্রে নানা দাগ । যাকে সৌরকলঙ্ক (‘সানস্পট’) বলা হয় । গ্যালিলিও সর্বপ্রথম দূরবীক্ষণ যন্ত্রের দ্বারা এই দাগ দেখতে পান । এই দাগের সংখ্যা একটি নির্দিষ্ট সময় পর বেড়ে যায় । আর এর সময়কাল হচ্ছে এগারো বছর ! ২০০১ সালে সৌরকলঙ্কের উপস্থিতি  সবথেকে বেশী ছিল । আর তাই এই বছর স্বাভাবিক ভাবেই সৌর দাগের সংখ্যা ক্রমবর্ধমান । মজার ব্যাপার হল  সেই সময় সূর্যের চঞ্চলতাও বেড়ে যায় যার প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়ে পৃথিবীতে ।      
নাসার বিজ্ঞানীরা গত ৭ জুন সূর্যের আকস্মিক বিস্ফোরণ ‘সোলার ডাইনামিকস অবজারভেটরি স্পেস ক্রাফট’-এ বিদ্যমান উচ্চ প্রযুক্তির ক্যামেরার সাহায্যে ভিডিও রেকর্ড করেছেন । বিজ্ঞানের ভাষায় এই বিস্ফোরণকে ‘করন্যাল মাস ইজেকশন’ বলা হয় । এই ইজেকশন হলে সূর্য থেকে আগত বিকিরণের মাত্রাও তখন বেড়ে যায় । এ যেন সূর্যের হাঁচি দেওয়ার মত ঘটনা । ২০০৬ সালে তেমন ঘটনা ঘটেছিল । আর সূর্যের এই হাঁচিতে সৃষ্টি হয় ‘সৌরঝড়’ । আগামী কয়েক মাস এই ঝড়ের প্রকোপ থাকবে । নাসার স্পেস ওয়েদার প্রেডিকশন সেন্টারের বিজ্ঞানী বিল মুর্তাঘ বলেছেন ‘সৌর বিকিরণ ঝড়ের ফলে মূলত: সূর্য থেকে উচ্চ শক্তির প্রোটন কণা নির্গত হয় । এই ঝড়ের প্রকোপ ডিসেম্বর ২০০৬ সালের করন্যাল মাস ইজেকশন থেকে একটু বেশী’। সূর্যের আবহমণ্ডল অধ্যয়ন করার জন্য ১২টি কৃত্রিম উপগ্রহ পৃথিবী থেকে প্রেরণ করা হয়েছে যারা প্রতিনিয়ত সূর্যের উপর নজরদারি রাখছে ।
    সৌরঝড়ের আবির্ভাবে নানা সমস্যার সৃষ্টি হয় । আমাদের বায়ুমণ্ডলের উপরিভাগে যেসব ‘কমুনিকেশন স্যাটেলাইট’ রয়েছে সেগুলোর উপর সব থেকে বেশী প্রভাব পড়ে । সূর্য থেকে আসা উচ্চশক্তির কণার আঘাতে ঐ স্যাটেলাইট গুলোর নানা যন্ত্রপাতি বিকল হয়ে যায়,  যার প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়ে যোগাযোগ ব্যবস্থায় । মোবাইল ফোন, ইন্টারনেট, স্যাটেলাইট নিয়ন্ত্রিত টিভি চ্যানেল, বিমান পরিষেবা, ব্যাংকিং পরিষেবা ইত্যাদি মারাত্মক ভাবে বাধাপ্রাপ্ত হয় ।  বিভিন্ন দেশের অর্থনীতিতেও এর প্রভাব পড়ে । ২০০৬ সালেও তেমন সৌরঝড়ের ঘটনা ঘটেছিল । এছাড়া রয়েছে ক্ষতিকারক রশ্মির পৃথিবীতে ঢুকে পড়ার আশঙ্কা । আসলে বায়ুমণ্ডলে ওজোনস্তরের উপস্থিতির জন্য অতিবেগুনি রশ্মি পৃথিবীতে পৌছাতে পারেনা । কিন্তু পরিবেশ প্রদূষণের ফলে ওজোনস্তরে দেখা দিয়েছে ফুটো, আর এ নিয়ে শঙ্কায় রয়েছেন বিজ্ঞানীরা । এই অতিবেগুনি রশ্মি পৃথিবীতে এসে পৌঁছালে মানবদেহে নানারকম চর্মরোগ দেখা দেবে । এমনকি স্কিন ক্যান্সারও হতে পারে । এছাড়া আরও নানারকম সর্বনাশা রোগের জন্ম হবারও সম্ভাবনা রয়েছে । সূর্যের সুনামির জন্য তাই পৃথিবী বাসির আতঙ্কিত হওয়া স্বাভাবিক ।     
    সৌরঝড় একটি প্রাকৃতিক ঘটনা । একে নিয়ন্ত্রিত করার ক্ষমতা বিজ্ঞানেরও নেই ! কিন্তু পৃথিবীর পরিবেশকে নিয়ন্ত্রিত করার ক্ষমতা আমাদের আছে । ওজোনস্তরের প্রলেপকে রক্ষা করার দায়িত্বও তাই পৃথিবী বাসির । কিন্তু এনিয়ে ভাবার সময় কি আমাদের আছে?

Saturday, March 19, 2011

‘সুপারমুন’-এর আবির্ভাবে সারা বিশ্ব আতঙ্কিত



লড়াই বেশ জমে উঠেছে ! ভবিতব্য বনাম কাকতালীয়-এর দ্বৈরথে তামাম বিশ্বের জনগণ দিশেহারা ! পৃথিবীর খুব কাছের উপগ্রহ চাঁদ প্রায় ১৮ বছর পর আজকের দিনেই সবথেকে নিকটে আসছে । আর তার এত কাছে আসা নিয়েই যত কাণ্ড । পূর্ণিমার চাঁদের আজ রাতের পোশাকী নাম সুপারমুন কি সত্যি প্রলয়ঙ্করের বার্তা নিয়ে এসেছে ?
     সম্প্রতি জাপানের সুনামি নিয়ে যখন সারা বিশ্ব আতঙ্কিত, তখন এর নেপথ্য ভিলেন হিসেবে চাঁদের নাম এসে যাওয়াটা কতটুকু যুক্তিযুক্ত সেটা নিয়েই এখন জোর চর্চা চলছে । লড়াইটা জ্যোতিষী বনাম জ্যোতির্বিদ-দের । চন্দ্র যখন পৃথিবীর খুব কাছে আসে তখন নাকি ভূমিকম্প, সুনামি, অনাবৃষ্টি, সাইক্লোন, আগ্নেয়গিরি উদ্গীরণ ইত্যাদি নানা বিপর্যয় এসে পৃথিবীকে গ্রাস করে । মুন থেকে সুপারমুন হয়ে উঠার পেছনে রয়েছে নানা ঘটনা । আর জ্যোতিষীদের এই বিশ্বাস নিয়েই যত আপত্তি জ্যোতির্বিদদের !
     চন্দ্র উপবৃত্তাকার পথে পৃথিবীকে প্রদক্ষিণ করে । এই ভাবে প্রদক্ষিণ করতে করতে একটা সময় আসে যখন সে পৃথিবীর সব থেকে দূরে চলে যায় । তখন তাকে অপভূ অবস্থান বলা হয় । এই দূরত্ব প্রায় চার লক্ষ ছয় হাজার তিনশো কিলোমিটার হয় । আর যখন চন্দ্র সব থেকে কাছে চলে আসে তখন তাকে অনুভূ অবস্থান বলা হয় ।  তখন পৃথিবী থেকে চাঁদের দূরত্ব হয় মাত্র তিন লক্ষ ছাপ্পান্ন হাজার ছয়শো কিলোমিটার । আর সে সময় চন্দ্রের আকৃতিও রোজকার আকার থেকে প্রায় বারো শতাংশ বড় হয় । সুপারমুন - চাঁদের বড় আকৃতির জন্য ১৯৭৯ সালে চন্দ্রের এই জম্পেশ নাম দিয়ে ছিলেন রিচার্ড নলে নামক এক জ্যোতিষী । তবে বেডমুন নামকরণ থেকে রিচার্ডের বিরত থাকার কারণটা অবশ্য অজ্ঞাত । তার বিশ্বাসমতে সুপারমুন পৃথিবীতে প্রলয়ঙ্করের বার্তা নিয়ে আসে ।
মহাপ্রলয়ের বিশ্বাসে বিশ্বাসীরা তো এক ধাপ এগিয়ে বলতে শুরু করে দিয়েছেন যে সুপারমুন মহাপ্রলয়ের সাইরেন বাজাতেই এসেছে যার জলজ্যান্ত উদাহরণ জাপানের প্রলয়ঙ্করী ভূমিকম্প আর তৎসঙ্গে সুনামি । আর মহাপ্রলয়ের জুজুতে যারা কাবু তাদের জন্য এই পরিঘটনা মস্তিষ্কে আলোড়ন তুলেছে । এর পেছনে সম্ভাব্য বৈজ্ঞানিক কারণ হিসেবে বলা হয়েছে যে যেহেতু চন্দ্র পৃথিবীর খুব নিকটে আসছে তখন চন্দ্রের মাধ্যাকর্ষণ শক্তির প্রকোপ পৃথিবীতে বেশী হবে, তার দরুণ পৃথিবীর চাঞ্চল্যতা বেড়ে যাবে । নিটফল- ভূমিকম্প, সুনামি, প্রবল ঘূর্ণিঝড় ইত্যাদি অঘটনের আবির্ভাব । অতীতেও সুপারমুন এর সময় তেমন ঘটনার উদাহরণ আছে । ১৯৩৮ এ ব্রিটেনে প্রবল ঝড়, ১৯৭৪ এ ভয়ঙ্কর সাইক্লোন, ২০০৫ এ ক্যাটরিনা হারিকেন, আর সাম্প্রতিক ২০১১ এর মার্চে জাপানের বিধ্বংসী সুনামি ইত্যাদি সুপারমুন এর বেড ইমেজ প্রদর্শন করছে । তাই সুপারমুন এর আবির্ভাবে  প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের সম্ভাবনা ভবিতব্য !
নিতান্তই কাকতালীয় ! বলছেন বিজ্ঞানীরা । জাপানের ৮.৯ রিখটার স্কেলের ভূমিকম্পের পর নাসার বিজ্ঞানী ডেভ উইলিয়াম ঘটনার পেছনে সুপারমুনের অদৃশ্য হাতের কথা ফুৎকারে উড়িয়ে দিয়েছেন । আমেরিকার জিওলোজিকেল সার্ভের ভূপদার্থবিদ জন বেলিনি প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের সঙ্গে সুপারমুন এর বিজ্ঞানসম্মত সম্পর্ক নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন । তার মতে এটা পরীক্ষিত সত্য নয় । ব্রিষ্টল বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূকম্পবিদ প্রোফেসর জর্জ হেলফ্রিকও এ ব্যাপারে একমত । ভূমিকম্পের মূল কারণ যে পৃথিবীর অন্দরে প্লেটের গতিশীলতার জন্য তা তিনি জোরগলায় বলেছেন । আর এর সঙ্গে চাঁদের প্রবল আকর্ষণের কোন কারণ নেই । আসলে আমাদের পৃথিবীর উপরিভাগ কঠিন হলে কি হবে তার অন্দরমহলে রয়েছে গরম, গলিত বস্তু । পৃথিবীর বহিঃস্তরে লিথোস্ফিয়ার আর অ্যাস্থেনোস্ফিয়ার নামক দুইটি স্তর আছে । লিথোস্ফিয়ার কঠিন, ঠান্ডা এবং অ্যাস্থেনোস্ফিয়ার তরল আর গরম । এই লিথোস্ফিয়ার মূলতঃ কয়েকটি প্লেটে বিভক্ত  যাকে টেক্টোনিক প্লেটস বলা হয়ে থাকে । এই প্লেট গুলো অ্যাস্থেনোস্ফিয়ার এর উপর ভাসতে থাকে । এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে আমাদের সাতটি মহাদেশ কয়েকটি প্লেটের উপরে ভাসমান । এই প্লেটগুলো কিন্তু ধীরে ধীরে সঞ্চালিত হতে থাকে । বিজ্ঞানীদের মতে হিমালয় পর্বতমালার সৃষ্টি নাকি এই প্লেটগুলোর সঞ্চালনের জন্য হয়েছে । যখন দুটি পাশাপাশি প্লেটের মধ্যে ঘর্ষণ হয় তখন কখনো কখনো ঐ প্লেটের সংযোগস্থলের উপরে থাকা অঞ্চলে ভূমিকম্পের সৃষ্টি হতে পারে ।  জাপান দাঁড়িয়ে রয়েছে তেমনই একটি গতিশীল প্লেটের উপরে যা আবার দুটি প্লেটের সংযোগস্থলও । তাই বিজ্ঞানীরা জাপানকে ভূমিকম্পের জন্য খুব বিপজ্জনক অঞ্চল বলে চিহ্নিত করেছেন । গত ১১ মার্চ প্রশান্ত মহাসাগরের তলদেশে থাকা প্রশান্ত মহাসাগরীয় প্লেটটি এক ধাক্কায় ইউরেশীয় প্লেটের তলায় ঢুকে যাওয়াতেই ঘটে গেল জাপানের সাম্প্রতিক ভুমিকম্প।
আহমেদাবাদের ফিজিক্যাল রিসার্চ ল্যাবরেটরির বিজ্ঞানী প্রোফেসর নরেন্দ্র ভান্ডারির বললেন ‘‘সুপারমুন এর ফলে শুধু জোঁয়ার ভাটায় প্রভাব পড়বে । আর এটা সত্য যে চন্দ্র সূর্যের আকর্ষণের জন্যই জোঁয়ার ভাটা হয়ে থাকে । সুপারমুন এর সময় সমুদ্রের জলোচ্ছাস আর জোঁয়ারের দাপট বেড়ে যাবে । ব্যস এই পর্যন্তই । এর থেকে বেশী প্রভাব পৃথিবীতে পড়বেনা ।
তাই সুপারমুন নিয়ে গুজব কল্পনার জগতে আলোড়ন তুলতে পারে, কিন্তু বাস্তবে মুন-এর প্রত্যক্ষ প্রভাব কোনভাবেই পৃথিবীর জন্য ক্ষতিকারক নয় । সুপারমুন এর সুপারম্যান ইমেজ অক্ষত থাকবে তা যতই ওকে কালিমালিপ্ত করা হোক না কেন !        

Monday, February 14, 2011

ভ্যালেন্টাইন দিবসেই অভিনব মিলন কাহিনীর চিত্রনাট্য রচনা করলো নাসা



মিলনের চিত্রনাট্য ২০০৭-এই লেখা হয়ে গিয়েছিল  । ২০১১ এর ভ্যালেন্টাইন ডে তেই অভিনব সাক্ষাৎ হতে যাচ্ছে দুজনের । প্রেমিকের বাড়ি পৃথিবীতে হলেও তার প্রেয়সী রয়েছেন মহাশূন্যেঈপ্সিত লক্ষ্যে যাত্রা শুরু হওয়ার সুদীর্ঘকাল পর আজ রাত্রি আটটা সাইত্রিশে (প্যাসিফিক স্ট্যান্ডার্ড টাইম মতে) আসছে সেই মাহেন্দ্রক্ষণ যখন প্রেমিকবর খুব কাছাকাছি হতে পারবেন তার প্রেমিকার । আর তারপরই তাদের প্রেম কাহিনী ইতিহাসের পাতায় স্থান করে নেবে ।
     কে বলে বিজ্ঞানীরা প্রেমের ব্যাপারে নিরস ? না হলে কি এমন দিন বেছে নিতেন মিলনের জন্য ? প্রেমিকের পরিচয় ? মানবসৃষ্ট এক অত্যাধুনিক মহাকাশযান ! আর প্রেয়সী ?  ধূমকেতু - রাতের আকাশে যার মনমাতানো রূপ দেখে সম্মোহিত হয়ে যেতে হয় ! নাসার বিজ্ঞানীরা নির্ভুল অঙ্ক কষে ষ্টারডাস্ট নেক্সট মহাকাশযানটি প্রেরণ করেছেন টেম্পল-১ নামক ধূমকেতুর দিকে যেটি আজ মাত্র দুশো কিলোমিটার কাছাকাছি চলে আসবে । তারপর আকুল ভরে সে তার প্রেমিকাকে উচ্চপ্রযুক্তির ক্যামেরা দিয়ে দেখবে, আর ফটো তুলে পৃথিবীতে প্রেরণ করতে থাকবে । লাজুক প্রেমিকার অবশ্য এই ফটো সেশনে আপত্তি নেই ! কারণ তাকে নিয়ে আগ্রহের কারণ যে বিজ্ঞানীদের অনেকদিনের পুরানো সেটা সে ভালই জানে ।
     রাতের আকাশে ধূমকেতুর আকস্মিক আগমন যুগযুগান্তর ধরে মোহিত করে রেখেছে পৃথিবী-বাসিদের । সূর্যের অমোঘ আকর্ষণে লক্ষ লক্ষ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করে এই পরিযায়ী মহাজাগতিক বস্তু হাজির হয় সৌরজগতে । পৃথিবীর পাশ দিয়ে হাসতে হাসতে হাত নেড়ে যাবার সময় সে দৃশ্যমান হয় এই গ্রহ থেকে । মায়াময় জগৎ থেকে সৌরজগতে ধূমকেতুর আগমনকে নাটকীয় ছাড়া আর কী বলা যায় ! কিছু বিজ্ঞানীরা বিশ্বাস করেন পৃথিবীতে প্রাণের বীজ বপন করেছিল ধূমকেতু । অতীত কালে পৃথিবীর খুব নিকট দিয়ে এক ধূমকেতু যাবার সময় পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণের ফলে সে প্রাণহীন গ্রহটিতে আছড়ে পড়ে । আর তারপরই অনুঘটকের মত প্রাণের প্রাথমিক বীজ  সে বপন করে । সৃষ্টি হয় অ্যামিনো এসিড যা প্রাণের জন্য একান্ত আবশ্যক । এককোষী প্রাণী সৃষ্টির মাধ্যমেই বিবর্তনের পথ শুরু হয়, আর তারপর কেটে গেছে কয়েক লক্ষ বছর । মানব সভ্যতা উন্নত হয়েছে আর এখন এই  কয়েক ফুট উচ্চতার এক প্রাণীর মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে একটি প্রশ্নই প্রাণ সৃষ্টির নেপথ্য কারণ কি ?
     ধূমকেতু হল একটি মহাজাগতিক বস্তু যার নিউক্লিয়াসের ব্যাসার্ধ ১ থেকে ১০ কিলোমিটার পর্যন্ত হতে পারে । মূলতঃ বরফ, পাথর আর অরগ্যানিক পদার্থ দিয়েই তৈরী সে । ধূমকেতুর বিশেষত্ব হল সূর্যের নিকটে আসলেই তার দুটি লেজ গজায় । একটিকে বলা হয় আয়ন টেল আর অপরটিকে ডাস্ট টেল ।  লেজগুলো সবসময় সূর্যের বিপরীতে থাকে । আবার যখন সে সূর্যের আকর্ষণ থেকে দূরে চলে যায় তখন লেজও গায়েব ! ধূমকেতু সূর্যের সামনে আসলে তার আকার বাড়তে থাকে, তখন সে বেলুনের মত ফুলতে থাকে যাকে কোমা বলা হয়ে থাকে । সাধারণতঃ কোমার আকার দশহাজার থেকে এক লক্ষ কিলোমিটার হয় তবে কোমার এই আকার হলেও ধূমকেতুর ঘনত্ব এত কম হয় যে তাকে কখনো বলা হয় বস্তা বোঝাই শূণ্যতা মূলতঃ গ্যাস, ধূলিকণার সমন্বয়ে তৈরি এই কোমার ক্লাউড ।
     গবেষণা থেকে দেখা গেছে যে ধূমকেতুর আর আমাদের সৌরজগতের বয়স প্রায় সমান ৪৫ কোটি বছর । বিজ্ঞানীরা এই ব্যাপারটা ভালই বুঝতে পেরেছেন যে ধূমকেতু অধ্যয়ন করলে সৌরজগতের সৃষ্টি রহস্য উদঘাটন করার পাশাপাশি পৃথিবীতে প্রাণ সৃষ্টির কারণও জানা যাবে । তাই ১৯৮৬ সালে হ্যালির ধূমকেতু যখন পৃথিবীর খুব কাছে এসেছিল, তখন পৃথিবী থেকে পাঁচটি মহাকাশযান ধূমকেতুটির খুব কাছে গিয়ে নানা রকম পরীক্ষা নিরীক্ষা করে । সম্প্রতি নাসার স্টারডাস্ট মিশন এর উদ্দেশ্য ছিল ওয়াইল্ড -২ নামক ধূমকেতুর স্যাম্পল সংগ্রহ করে পৃথিবীতে পাঠিয়ে দেওয়া । ২০০৪ সালে সে লক্ষ্য সফল হয়, আর ধূমকেতু থেকে সংগৃহীত স্যাম্পল ২০০৬ সালে স্টারডাস্ট মহাকাশযান থেকে ক্যাপসুলের মাধ্যমে পৃথিবীতে পাঠানো হয় যা পরবর্তীতে ল্যাবরেটরিতে বিশ্লেষণ করা হয় এই সাফল্যে খুশি হয়ে নাসার বিজ্ঞানীরা পরবর্তী মিশনের রূপরেখা তৈরি করলেন যার নাম - ষ্টারডাস্ট নেক্সট মিশনমহাকাশযানটির নুতন লক্ষ্য স্থির হল টেম্পল-১ ধূমকেতু । পৃথিবীতে ফিরে আসা তার হলনা, যানটিকে ২০০৭ সালেই ঘুরিয়ে দেওয়া হল তার নূতন বান্ধবীর দিকে । ধূমকেতুটির ব্যাস প্রায় ছয় কিলোমিটার, আর সূর্যের চারিপাশে প্রদক্ষিণ করতে তার সময় লাগে সাড়ে পাঁচ বছর । অবশ্য এই ধূমকেতুটিকে নাসার অপর একটি মিশন ডিপ ইম্প্যাক্ট ও ২০০৫ সালে অধ্যয়ন করে । নানা গুরুত্বপূর্ণ তথ্য বেরিয়ে আসে সেই মিশন থেকে । তবুও কিছু অপূর্ণতা থেকে যায় । আর সেটা পূরণ করতেই নাসার এই নূতন মিশন । প্যাসিফিক স্ট্যান্ডার্ড টাইম মতে ১৪ ফেব্রুয়ারি রাত আটটা সাইত্রিশে (ভারতীয় সময় মতে ১৫ ফেব্রুয়ারি সকাল দশটা সাতে) মহাকাশযানটি টেম্পল ধূমকেতুটির  প্রায় দুশো কিলোমিটার নিকটে চলে আসবে । আর তারপরেই তাদের মিলনে রচিত হবে বিজ্ঞানের এক নূতন ইতিহাস ।
     অবশেষে কিশোর আর আশার একটি কালজয়ী গান গুনগুন না করলে লেখাটা অসমাপ্তই থেকে যাবে
     এক ম্যায় অউর এক তু, দোনো মিলে ইস তরাহ ...