Saturday, March 19, 2011

‘সুপারমুন’-এর আবির্ভাবে সারা বিশ্ব আতঙ্কিত



লড়াই বেশ জমে উঠেছে ! ভবিতব্য বনাম কাকতালীয়-এর দ্বৈরথে তামাম বিশ্বের জনগণ দিশেহারা ! পৃথিবীর খুব কাছের উপগ্রহ চাঁদ প্রায় ১৮ বছর পর আজকের দিনেই সবথেকে নিকটে আসছে । আর তার এত কাছে আসা নিয়েই যত কাণ্ড । পূর্ণিমার চাঁদের আজ রাতের পোশাকী নাম সুপারমুন কি সত্যি প্রলয়ঙ্করের বার্তা নিয়ে এসেছে ?
     সম্প্রতি জাপানের সুনামি নিয়ে যখন সারা বিশ্ব আতঙ্কিত, তখন এর নেপথ্য ভিলেন হিসেবে চাঁদের নাম এসে যাওয়াটা কতটুকু যুক্তিযুক্ত সেটা নিয়েই এখন জোর চর্চা চলছে । লড়াইটা জ্যোতিষী বনাম জ্যোতির্বিদ-দের । চন্দ্র যখন পৃথিবীর খুব কাছে আসে তখন নাকি ভূমিকম্প, সুনামি, অনাবৃষ্টি, সাইক্লোন, আগ্নেয়গিরি উদ্গীরণ ইত্যাদি নানা বিপর্যয় এসে পৃথিবীকে গ্রাস করে । মুন থেকে সুপারমুন হয়ে উঠার পেছনে রয়েছে নানা ঘটনা । আর জ্যোতিষীদের এই বিশ্বাস নিয়েই যত আপত্তি জ্যোতির্বিদদের !
     চন্দ্র উপবৃত্তাকার পথে পৃথিবীকে প্রদক্ষিণ করে । এই ভাবে প্রদক্ষিণ করতে করতে একটা সময় আসে যখন সে পৃথিবীর সব থেকে দূরে চলে যায় । তখন তাকে অপভূ অবস্থান বলা হয় । এই দূরত্ব প্রায় চার লক্ষ ছয় হাজার তিনশো কিলোমিটার হয় । আর যখন চন্দ্র সব থেকে কাছে চলে আসে তখন তাকে অনুভূ অবস্থান বলা হয় ।  তখন পৃথিবী থেকে চাঁদের দূরত্ব হয় মাত্র তিন লক্ষ ছাপ্পান্ন হাজার ছয়শো কিলোমিটার । আর সে সময় চন্দ্রের আকৃতিও রোজকার আকার থেকে প্রায় বারো শতাংশ বড় হয় । সুপারমুন - চাঁদের বড় আকৃতির জন্য ১৯৭৯ সালে চন্দ্রের এই জম্পেশ নাম দিয়ে ছিলেন রিচার্ড নলে নামক এক জ্যোতিষী । তবে বেডমুন নামকরণ থেকে রিচার্ডের বিরত থাকার কারণটা অবশ্য অজ্ঞাত । তার বিশ্বাসমতে সুপারমুন পৃথিবীতে প্রলয়ঙ্করের বার্তা নিয়ে আসে ।
মহাপ্রলয়ের বিশ্বাসে বিশ্বাসীরা তো এক ধাপ এগিয়ে বলতে শুরু করে দিয়েছেন যে সুপারমুন মহাপ্রলয়ের সাইরেন বাজাতেই এসেছে যার জলজ্যান্ত উদাহরণ জাপানের প্রলয়ঙ্করী ভূমিকম্প আর তৎসঙ্গে সুনামি । আর মহাপ্রলয়ের জুজুতে যারা কাবু তাদের জন্য এই পরিঘটনা মস্তিষ্কে আলোড়ন তুলেছে । এর পেছনে সম্ভাব্য বৈজ্ঞানিক কারণ হিসেবে বলা হয়েছে যে যেহেতু চন্দ্র পৃথিবীর খুব নিকটে আসছে তখন চন্দ্রের মাধ্যাকর্ষণ শক্তির প্রকোপ পৃথিবীতে বেশী হবে, তার দরুণ পৃথিবীর চাঞ্চল্যতা বেড়ে যাবে । নিটফল- ভূমিকম্প, সুনামি, প্রবল ঘূর্ণিঝড় ইত্যাদি অঘটনের আবির্ভাব । অতীতেও সুপারমুন এর সময় তেমন ঘটনার উদাহরণ আছে । ১৯৩৮ এ ব্রিটেনে প্রবল ঝড়, ১৯৭৪ এ ভয়ঙ্কর সাইক্লোন, ২০০৫ এ ক্যাটরিনা হারিকেন, আর সাম্প্রতিক ২০১১ এর মার্চে জাপানের বিধ্বংসী সুনামি ইত্যাদি সুপারমুন এর বেড ইমেজ প্রদর্শন করছে । তাই সুপারমুন এর আবির্ভাবে  প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের সম্ভাবনা ভবিতব্য !
নিতান্তই কাকতালীয় ! বলছেন বিজ্ঞানীরা । জাপানের ৮.৯ রিখটার স্কেলের ভূমিকম্পের পর নাসার বিজ্ঞানী ডেভ উইলিয়াম ঘটনার পেছনে সুপারমুনের অদৃশ্য হাতের কথা ফুৎকারে উড়িয়ে দিয়েছেন । আমেরিকার জিওলোজিকেল সার্ভের ভূপদার্থবিদ জন বেলিনি প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের সঙ্গে সুপারমুন এর বিজ্ঞানসম্মত সম্পর্ক নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন । তার মতে এটা পরীক্ষিত সত্য নয় । ব্রিষ্টল বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূকম্পবিদ প্রোফেসর জর্জ হেলফ্রিকও এ ব্যাপারে একমত । ভূমিকম্পের মূল কারণ যে পৃথিবীর অন্দরে প্লেটের গতিশীলতার জন্য তা তিনি জোরগলায় বলেছেন । আর এর সঙ্গে চাঁদের প্রবল আকর্ষণের কোন কারণ নেই । আসলে আমাদের পৃথিবীর উপরিভাগ কঠিন হলে কি হবে তার অন্দরমহলে রয়েছে গরম, গলিত বস্তু । পৃথিবীর বহিঃস্তরে লিথোস্ফিয়ার আর অ্যাস্থেনোস্ফিয়ার নামক দুইটি স্তর আছে । লিথোস্ফিয়ার কঠিন, ঠান্ডা এবং অ্যাস্থেনোস্ফিয়ার তরল আর গরম । এই লিথোস্ফিয়ার মূলতঃ কয়েকটি প্লেটে বিভক্ত  যাকে টেক্টোনিক প্লেটস বলা হয়ে থাকে । এই প্লেট গুলো অ্যাস্থেনোস্ফিয়ার এর উপর ভাসতে থাকে । এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে আমাদের সাতটি মহাদেশ কয়েকটি প্লেটের উপরে ভাসমান । এই প্লেটগুলো কিন্তু ধীরে ধীরে সঞ্চালিত হতে থাকে । বিজ্ঞানীদের মতে হিমালয় পর্বতমালার সৃষ্টি নাকি এই প্লেটগুলোর সঞ্চালনের জন্য হয়েছে । যখন দুটি পাশাপাশি প্লেটের মধ্যে ঘর্ষণ হয় তখন কখনো কখনো ঐ প্লেটের সংযোগস্থলের উপরে থাকা অঞ্চলে ভূমিকম্পের সৃষ্টি হতে পারে ।  জাপান দাঁড়িয়ে রয়েছে তেমনই একটি গতিশীল প্লেটের উপরে যা আবার দুটি প্লেটের সংযোগস্থলও । তাই বিজ্ঞানীরা জাপানকে ভূমিকম্পের জন্য খুব বিপজ্জনক অঞ্চল বলে চিহ্নিত করেছেন । গত ১১ মার্চ প্রশান্ত মহাসাগরের তলদেশে থাকা প্রশান্ত মহাসাগরীয় প্লেটটি এক ধাক্কায় ইউরেশীয় প্লেটের তলায় ঢুকে যাওয়াতেই ঘটে গেল জাপানের সাম্প্রতিক ভুমিকম্প।
আহমেদাবাদের ফিজিক্যাল রিসার্চ ল্যাবরেটরির বিজ্ঞানী প্রোফেসর নরেন্দ্র ভান্ডারির বললেন ‘‘সুপারমুন এর ফলে শুধু জোঁয়ার ভাটায় প্রভাব পড়বে । আর এটা সত্য যে চন্দ্র সূর্যের আকর্ষণের জন্যই জোঁয়ার ভাটা হয়ে থাকে । সুপারমুন এর সময় সমুদ্রের জলোচ্ছাস আর জোঁয়ারের দাপট বেড়ে যাবে । ব্যস এই পর্যন্তই । এর থেকে বেশী প্রভাব পৃথিবীতে পড়বেনা ।
তাই সুপারমুন নিয়ে গুজব কল্পনার জগতে আলোড়ন তুলতে পারে, কিন্তু বাস্তবে মুন-এর প্রত্যক্ষ প্রভাব কোনভাবেই পৃথিবীর জন্য ক্ষতিকারক নয় । সুপারমুন এর সুপারম্যান ইমেজ অক্ষত থাকবে তা যতই ওকে কালিমালিপ্ত করা হোক না কেন !        

Monday, February 14, 2011

ভ্যালেন্টাইন দিবসেই অভিনব মিলন কাহিনীর চিত্রনাট্য রচনা করলো নাসা



মিলনের চিত্রনাট্য ২০০৭-এই লেখা হয়ে গিয়েছিল  । ২০১১ এর ভ্যালেন্টাইন ডে তেই অভিনব সাক্ষাৎ হতে যাচ্ছে দুজনের । প্রেমিকের বাড়ি পৃথিবীতে হলেও তার প্রেয়সী রয়েছেন মহাশূন্যেঈপ্সিত লক্ষ্যে যাত্রা শুরু হওয়ার সুদীর্ঘকাল পর আজ রাত্রি আটটা সাইত্রিশে (প্যাসিফিক স্ট্যান্ডার্ড টাইম মতে) আসছে সেই মাহেন্দ্রক্ষণ যখন প্রেমিকবর খুব কাছাকাছি হতে পারবেন তার প্রেমিকার । আর তারপরই তাদের প্রেম কাহিনী ইতিহাসের পাতায় স্থান করে নেবে ।
     কে বলে বিজ্ঞানীরা প্রেমের ব্যাপারে নিরস ? না হলে কি এমন দিন বেছে নিতেন মিলনের জন্য ? প্রেমিকের পরিচয় ? মানবসৃষ্ট এক অত্যাধুনিক মহাকাশযান ! আর প্রেয়সী ?  ধূমকেতু - রাতের আকাশে যার মনমাতানো রূপ দেখে সম্মোহিত হয়ে যেতে হয় ! নাসার বিজ্ঞানীরা নির্ভুল অঙ্ক কষে ষ্টারডাস্ট নেক্সট মহাকাশযানটি প্রেরণ করেছেন টেম্পল-১ নামক ধূমকেতুর দিকে যেটি আজ মাত্র দুশো কিলোমিটার কাছাকাছি চলে আসবে । তারপর আকুল ভরে সে তার প্রেমিকাকে উচ্চপ্রযুক্তির ক্যামেরা দিয়ে দেখবে, আর ফটো তুলে পৃথিবীতে প্রেরণ করতে থাকবে । লাজুক প্রেমিকার অবশ্য এই ফটো সেশনে আপত্তি নেই ! কারণ তাকে নিয়ে আগ্রহের কারণ যে বিজ্ঞানীদের অনেকদিনের পুরানো সেটা সে ভালই জানে ।
     রাতের আকাশে ধূমকেতুর আকস্মিক আগমন যুগযুগান্তর ধরে মোহিত করে রেখেছে পৃথিবী-বাসিদের । সূর্যের অমোঘ আকর্ষণে লক্ষ লক্ষ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করে এই পরিযায়ী মহাজাগতিক বস্তু হাজির হয় সৌরজগতে । পৃথিবীর পাশ দিয়ে হাসতে হাসতে হাত নেড়ে যাবার সময় সে দৃশ্যমান হয় এই গ্রহ থেকে । মায়াময় জগৎ থেকে সৌরজগতে ধূমকেতুর আগমনকে নাটকীয় ছাড়া আর কী বলা যায় ! কিছু বিজ্ঞানীরা বিশ্বাস করেন পৃথিবীতে প্রাণের বীজ বপন করেছিল ধূমকেতু । অতীত কালে পৃথিবীর খুব নিকট দিয়ে এক ধূমকেতু যাবার সময় পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণের ফলে সে প্রাণহীন গ্রহটিতে আছড়ে পড়ে । আর তারপরই অনুঘটকের মত প্রাণের প্রাথমিক বীজ  সে বপন করে । সৃষ্টি হয় অ্যামিনো এসিড যা প্রাণের জন্য একান্ত আবশ্যক । এককোষী প্রাণী সৃষ্টির মাধ্যমেই বিবর্তনের পথ শুরু হয়, আর তারপর কেটে গেছে কয়েক লক্ষ বছর । মানব সভ্যতা উন্নত হয়েছে আর এখন এই  কয়েক ফুট উচ্চতার এক প্রাণীর মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে একটি প্রশ্নই প্রাণ সৃষ্টির নেপথ্য কারণ কি ?
     ধূমকেতু হল একটি মহাজাগতিক বস্তু যার নিউক্লিয়াসের ব্যাসার্ধ ১ থেকে ১০ কিলোমিটার পর্যন্ত হতে পারে । মূলতঃ বরফ, পাথর আর অরগ্যানিক পদার্থ দিয়েই তৈরী সে । ধূমকেতুর বিশেষত্ব হল সূর্যের নিকটে আসলেই তার দুটি লেজ গজায় । একটিকে বলা হয় আয়ন টেল আর অপরটিকে ডাস্ট টেল ।  লেজগুলো সবসময় সূর্যের বিপরীতে থাকে । আবার যখন সে সূর্যের আকর্ষণ থেকে দূরে চলে যায় তখন লেজও গায়েব ! ধূমকেতু সূর্যের সামনে আসলে তার আকার বাড়তে থাকে, তখন সে বেলুনের মত ফুলতে থাকে যাকে কোমা বলা হয়ে থাকে । সাধারণতঃ কোমার আকার দশহাজার থেকে এক লক্ষ কিলোমিটার হয় তবে কোমার এই আকার হলেও ধূমকেতুর ঘনত্ব এত কম হয় যে তাকে কখনো বলা হয় বস্তা বোঝাই শূণ্যতা মূলতঃ গ্যাস, ধূলিকণার সমন্বয়ে তৈরি এই কোমার ক্লাউড ।
     গবেষণা থেকে দেখা গেছে যে ধূমকেতুর আর আমাদের সৌরজগতের বয়স প্রায় সমান ৪৫ কোটি বছর । বিজ্ঞানীরা এই ব্যাপারটা ভালই বুঝতে পেরেছেন যে ধূমকেতু অধ্যয়ন করলে সৌরজগতের সৃষ্টি রহস্য উদঘাটন করার পাশাপাশি পৃথিবীতে প্রাণ সৃষ্টির কারণও জানা যাবে । তাই ১৯৮৬ সালে হ্যালির ধূমকেতু যখন পৃথিবীর খুব কাছে এসেছিল, তখন পৃথিবী থেকে পাঁচটি মহাকাশযান ধূমকেতুটির খুব কাছে গিয়ে নানা রকম পরীক্ষা নিরীক্ষা করে । সম্প্রতি নাসার স্টারডাস্ট মিশন এর উদ্দেশ্য ছিল ওয়াইল্ড -২ নামক ধূমকেতুর স্যাম্পল সংগ্রহ করে পৃথিবীতে পাঠিয়ে দেওয়া । ২০০৪ সালে সে লক্ষ্য সফল হয়, আর ধূমকেতু থেকে সংগৃহীত স্যাম্পল ২০০৬ সালে স্টারডাস্ট মহাকাশযান থেকে ক্যাপসুলের মাধ্যমে পৃথিবীতে পাঠানো হয় যা পরবর্তীতে ল্যাবরেটরিতে বিশ্লেষণ করা হয় এই সাফল্যে খুশি হয়ে নাসার বিজ্ঞানীরা পরবর্তী মিশনের রূপরেখা তৈরি করলেন যার নাম - ষ্টারডাস্ট নেক্সট মিশনমহাকাশযানটির নুতন লক্ষ্য স্থির হল টেম্পল-১ ধূমকেতু । পৃথিবীতে ফিরে আসা তার হলনা, যানটিকে ২০০৭ সালেই ঘুরিয়ে দেওয়া হল তার নূতন বান্ধবীর দিকে । ধূমকেতুটির ব্যাস প্রায় ছয় কিলোমিটার, আর সূর্যের চারিপাশে প্রদক্ষিণ করতে তার সময় লাগে সাড়ে পাঁচ বছর । অবশ্য এই ধূমকেতুটিকে নাসার অপর একটি মিশন ডিপ ইম্প্যাক্ট ও ২০০৫ সালে অধ্যয়ন করে । নানা গুরুত্বপূর্ণ তথ্য বেরিয়ে আসে সেই মিশন থেকে । তবুও কিছু অপূর্ণতা থেকে যায় । আর সেটা পূরণ করতেই নাসার এই নূতন মিশন । প্যাসিফিক স্ট্যান্ডার্ড টাইম মতে ১৪ ফেব্রুয়ারি রাত আটটা সাইত্রিশে (ভারতীয় সময় মতে ১৫ ফেব্রুয়ারি সকাল দশটা সাতে) মহাকাশযানটি টেম্পল ধূমকেতুটির  প্রায় দুশো কিলোমিটার নিকটে চলে আসবে । আর তারপরেই তাদের মিলনে রচিত হবে বিজ্ঞানের এক নূতন ইতিহাস ।
     অবশেষে কিশোর আর আশার একটি কালজয়ী গান গুনগুন না করলে লেখাটা অসমাপ্তই থেকে যাবে
     এক ম্যায় অউর এক তু, দোনো মিলে ইস তরাহ ...

Tuesday, February 1, 2011

আবেগের জোয়ারে ভাসলেন দাদা


তাঁকে নিয়ে আবেগের আলোড়ন যে এই অঞ্চলে অনেকদিন থেকেই বিরাজমান এই খবর তিনি রাখেন । আর তাই তো আসাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুরোধে এত ব্যস্ততার মধ্যেও তিনি চলে আসেন অত্যন্ত স্বল্পকালীন সফরে, আবেগের সমুদ্রে অবগাহন করতে ।
     রাতারাতি কোনো নায়ক হয়ে উঠেননি তিনি চারিত্রিক দৃঢ়তা, লড়াকু মানসিকতা আর ইতিবাচক চিন্তার যথাযথ প্রয়োগ করে তিনি হয়ে উঠেছিলেন ক্রিকেট খেলায় ভারতের সর্বকালের শ্রেষ্ঠ কাপ্তান । বিশ্বের দরবারে ভারতের মানকে কয়েক ধাপ উপরে নিয়ে যাবার মহানায়ক সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়, অবশেষে হাজির শহিদের শহর শিলচরে । বরাকবাসীর গর্বের বিশ্ববিদ্যালয় সৌরভকে সাম্মানিক ডক্টরেট উপাধিতে ভূষিত করলো যা তাঁর পদক প্রাপ্তির ভাঁড়ারে নবতম সংযোজন ।
     কলকাতা থেকে সৌরভের শুধু একটিই বার্তা ছিল যে সকালে শিলচরে এসে একটু জিমে যাওয়ার ব্যবস্থা যেন করা হয়শরীরচর্চা দিয়েই তাঁর রোজকার জীবন শুরু হয়, তাই বাংলার দ্বিতীয় ভূখণ্ডে এসেও তিনি তা ফাকি দিতে চাননা । নিয়মানুবর্তিতা যে তাঁর রন্ধ্রে রন্ধ্রে । বিশ্ববিদ্যালয়ের তরফ থেকে তাই কাছাড় ক্লাবেই তাঁর বিশ্রামের ব্যবস্থা করা হয় যেখানে রয়েছে আধুনিক ব্যায়ামাগার মঙ্গলবার সকাল ঠিক আটটা দশে সৌরভ শিলচরে চেক ইন করেন । তারপর ফ্রেশ হবার পর প্রাতরাশের কথা বলায় তিনি মানা করেন । ধীরে ধীরে প্রস্তুত হচ্ছেন জিমে যাবেন, তখন ঘড়িতে নটা বেজে গেছে । এদিকে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ঘন ঘন ফোন আসছে, কারণ অনুষ্ঠান উদ্বোধনিতে গাঙ্গুলির উপস্থিতি যে খুবই দরকার । খবরটি দাদার কানে পৌছার পর শরীরচর্চা আপাত স্থগিত রেখে বেরিয়ে পড়লেন সৌরভ । ঘড়িতে তখন সকাল নটা দশ । 
     প্রিন্স অব কলকাতা-যে ডক্টরেট উপাধিতে ভূষিত হতে যাচ্ছেন এ খবর ইন্টারনেটের জনপ্রিয় সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং সাইট ফেসবুক এর মাধ্যমে তামাম বিশ্বের মানুষ কিছুদিন আগেই জেনে গেছেন ব্লগের অসংখ্য পাতায় ফুটে উঠছে মহারাজের ফ্যানদের শুভেচ্ছা বার্তা । বলতেই হয় সাইবার জগতে ক্রিকেটের রয়াল বেঙ্গল টাইগারের উপস্থিতি ক্রিকেট জগতের মতই উজ্জ্বল । 
বরাক উপত্যকায় সৌরভের ঝটিকা সফর এক আলাদা ইতিহাস রচনা করলো । কারণ এই গ্রহে আসাম বিশ্ববিদ্যালয়ই সর্বপ্রথম তাঁকে সাম্মানিক ডক্টরেট উপাধিতে সম্মান জানালো । নিঃসন্দেহে সৌরভের ব্যক্তিগত প্রোফাইলের পাতায়ও পয়লা ফেব্রুয়ারির দিনটি স্মরণীয় হয়ে থাকবেএর ঠিক দেড় বছর আগে ১৫ জুলাই ২০০৯ এ খেলাধুলায় অসামান্য অবদানের জন্য ব্রিটেনের সেন্ট্রাল ল্যাঙ্কাশায়ার ইউনিভার্সিটি  সৌরভকে সাম্মানিক বৃত্তি প্রদান করে ।
সকাল ঠিক দশটা দশে সাদা স্করপিও গাড়িটি এসে নেতাজী মঞ্চের পাশে এসে দাঁড়ালো । গাড়ি থেকে নেমে এলেন বাঙালির একালের রোল মডেল সবার প্রিয় দাদানীল ব্লেজার-স্যুট আর বেগুনি টাই এর ব্যাকগ্রাউণ্ডে সাদা শার্ট পরিহিত দাদা বা হাতের রূপালি রঙের রোল রয়েস ঘড়িটা সূর্যের আলোতে চকচক করছে ।  খয়েরী রঙের ফ্রেমের চশমা পরিহিত মানুষটাই আজকের অনুষ্ঠানের মুখ্য আকর্ষণ । আর একটু পরই পোষাক বদলে সোনালি সুতোয় কাজ করা লাল গাউন পরবেন তিনি ।  দাদার ঠিক পেছনে ঘোড়ার উপর বসে থাকা নেতাজীর মূর্তি মনে করিয়ে দিচ্ছিল বাঙালির সেকালের আর এক রোল মডেলের কথা । প্রকৃত অর্থেই সেকাল আর একালের যুগলকে একই ফ্রেমে দেখে মন প্রাণ ভরে উঠলো ।  
নেতাজী মঞ্চের দিকে দাদার বীরদর্পে হেঁটে যাওয়া মনে করিয়ে দিচ্ছিল পুরানো দিনের দৃশ্য সেই আত্মবিশ্বাসী অভিব্যক্তি যা কিনা ক্রিকেটের ময়দানে সৌরভকে এক আলাদা পরিচয় এনে দেয় । সমাবর্তন অনুষ্ঠানের স্পটলাইট যেন আজ কিছুটা পক্ষপাতপুষ্টভেতরে উপস্থিত ডিগ্রিধারি থেকে পদাধিকারী-হাজার জোড়া চোখ প্রাণ ভরে দেখছে ক্রিকেট বিশ্বের এক উজ্জ্বল নক্ষত্রকে । শিক্ষায়তনিক পরিসরে দাদার উপস্থিতি খেলা আর শিক্ষার জগতকে যেন আজ পাশাপাশি নিয়ে এলো
উপাচার্য তপোধীর ভট্টাচার্যের ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে সৌরভের কেরিয়ারের গ্রাফ নড়েচড়ে আবার উর্দ্ধমুখে ধাবিত হল । মৃদু হাসি দাদার মুখে। এই সম্মান যেন ভুলিয়ে দেবে সব বঞ্চনা...।  
তারপর নিজ আসনে বসে দাদা ভলান্টিয়ারকে ডেকে এক কাপ চা দিতে বললেন । এর অল্পকিছুক্ষণ পর সমাবর্তন অনুষ্ঠান শেষ হবার পর সাজঘরে দাদাকে পেয়ে জিজ্ঞাসা করেই ফেললাম - আপনাকে নিয়ে এ অঞ্চলের মানুষের চরম আবেগের খবর কি আপনি রাখেন? চটজলদি উত্তর, তাই তো ছুটে এলাম আবেগের সম্মান দিতে আর আগামীতেও আবার এখানে বারবার আসতে চাইবো স্বল্পকথার সৌরভ বিশ্ববিদ্যালয়কে সাধুবাদ জানাতেও ভুলেননি । পাহাড়ঘেরা ক্যাম্পাসের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে দাদা মুগ্ধ । আগামীতে বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যালুমনি অ্যাসোসিয়েশনের সদস্য হবারও প্রবল ইচ্ছে তাঁর ।
দুপুর ঠিক পৌনে একটায় দাদা স্বল্পক্ষণের জন্য খোলা মঞ্চে এসে দাড়ালেন । দাদা দাদা চিৎকারে আকাশ বাতাস কেঁপে উঠলো । ক্রিকেটের ময়দানে দাপিয়ে বেড়ানো অফ সাইডের ভগবানকে দেখার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রবেশপথে নজরকাড়া ভিড় ছিল । যারা সমাবর্তন অনুষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত নয় তাদের ভিড় সামলাবার জন্য কর্তৃপক্ষকে বিশেষ ব্যবস্থা করতে হয়েছে । দাদাকে একটিবার মানসচক্ষে দেখবার জন্য সবার উৎসাহ ছিল দেখার মত । বিশ্ববিদ্যালয় পরিবারের শিক্ষক, অশিক্ষক কর্মচারী, ছাত্রছাত্রী ছাড়াও স্থানীয় মানুষদের অবস্থানে ক্যাম্পাস এক উৎসবমুখর পরিবেশের সৃষ্টি হয়েছিল ।
দাদাকে নিয়ে এক জবর খবর জানলাম তিনি যাবার পর । বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন অনুষ্ঠানের রিসেপশন কমিটির চেয়ারম্যান ডঃ নিরঞ্জন রায় জানালেন যে সাম্মানিক ডক্টরেট উপাধিতে ভূষিত হবার আগে পর্যন্ত দাদা উপোস ছিলেন । কারণ দাদার ইচ্ছে সাত্বিকভাবেই তিনি এই সম্মান গ্রহন করবেন । আর ডিগ্রি নেবার পরই তিনি চা পান করেন, তারপর হালকা নিরামিষ খাবার । আমিষ আজ নৈব নৈব চ ।  
            সত্যি ডঃ সৌরভ চণ্ডিদাস গঙ্গোপাধ্যায়, তোমাকে হাজার সেলাম !

Wednesday, November 24, 2010

মহাযন্ত্রের আঁতুরঘরে অবশেষে জন্ম হল ‘অ্যান্টিম্যাটার’-এর


১৭ নভেম্বর ২০১০ । ‘নেচার’ সাময়িকীতে গবেষণাপত্রটি প্রকাশিত হবার পর বিজ্ঞানের জগতে সেটি এক ‘মহাবিস্ফোরণ’ ঘটালো ! বিশ্বের সর্ববৃহৎ যন্ত্রের আঁতুরঘরে অবশেষে জন্ম হল ‘অ্যান্টিম্যাটার’ এর যা শুধু এতদিন তাত্বিক জগতে সীমাবদ্ধ ছিল । ডঃ জি বি অ্যান্ড্রিসেন আর তার সহযোগী ৪১ জন বিজ্ঞানীদের তপস্যায় মুগ্ধ হয়ে ‘অ্যান্টিহাইড্রোজেন’ স্বল্প সময়ের জন্য আবির্ভূত হলেন বিজ্ঞানীদের সম্মুখে ।
‘এল এইচ সি’ (লার্জ হ্যাডরন কলাইডার) নামটি অনেকআগেই বিজ্ঞানীদের গন্ডি অতিক্রম করে সাধারণ মানুষের অন্দরমহলে ঢুকে পড়েছে । ‘দ্য ইউরোপিয়ান অর্গেনাইজেশন ফর নিউক্লিয়ার রিসার্চ’ (সার্ন) এর বদান্যতায় তৈরী এটিই পৃথিবীর সর্ববৃহৎ যন্ত্র ! ফ্রান্স এবং স্যুইজারল্যান্ডের সীমানার ২৭ কিলোমিটার পরিধির বৃত্তাকার এক টানেলের মধ্যেই তার আবাস । সারা বিশ্বের প্রায় দশহাজার বিজ্ঞানী এবং ইঞ্জিনিয়ারদের অক্লান্ত পরিশ্রমের ফসল এই যন্ত্রটির অবস্থান মাটির তলায় ১৭৫ মিটার নিচে যা বানাতে খরচ হয়েছে প্রায় ৯০ কোটি ডলার ! মহাবিশ্বের জন্মরহস্য অনুসন্ধান, ‘ভগবান কণা’ (বা ‘হিগস কনা’) এর পরীক্ষামূলক অস্তিত্বের সন্ধান, ‘ডার্ক ম্যাটার’ আর ‘ডার্ক এনার্জি’ এর রহস্য উন্মোচনের পাশাপাশি ‘গ্র্যান্ড ইউনিফিকেশন থিওরি’ তৈরীর লক্ষেই ‘এল এইচ সি’ –এর জন্ম ।
          জন্মের মুহূর্ত থেকেই ‘এল এইচ সি’ বিতর্কের ঘেরাটোপে । খবরের শিরোনাম দখল করার এক অদৃশ্য তাগিদ যেন তার জন্ম কুন্ডলিতে লিখে রেখেছেন বিজ্ঞানীরা ! ১০ সেপ্টেম্বর, ২০০৮ এ তার আবির্ভাবেই সাধারণ মানুষের মধ্যে ‘বিগব্যাং’ বা ‘মহাবিস্ফোরণ’-এর আতঙ্ক ছড়িয়ে যায় । এক মহল থেকে প্রচার করা হয়েছিল ‘এল এইচ সি’ তে যে বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা নিরিক্ষা করা হচ্ছে তার ফলে নাকি আমাদের গ্রহ চিরতরে নির্মূল হয়ে যেতে পারে । কিন্তু সেই অপপ্রচারে বিজ্ঞানের তেমন ক্ষতি হলনা । ‘এল এইচ সি’ এর বিজয় রথ এগিয়ে যেতেই লাগলো । ৩০শে মার্চ, ২০১০ সালে আবারও সে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসলো । প্রায় আলোর গতিতে ধেয়ে আসা দু’টি প্রোটনের সংঘর্ষে সর্বপ্রথম ৭ টেরা ইলেক্ট্রনভল্টের শক্তি সৃষ্টি হল মানবসৃষ্ট ল্যাবরেটরিতে । গবেষণার ক্ষেত্রে নিঃসন্দেহে এ ছিল এক অনন্য অগ্রসরতা । আর সাম্প্রতিক খবর তো অন্য সব খবরকে পিছনে ফেলে দিয়েছে ।
আমাদের এই বস্তু জগৎ সৃষ্টির নেপথ্যে রয়েছে নানাবিধ কণার সংমিশ্রণ । যেমন – ইলেকট্রন, প্রোটন, নিউট্রন । এ ছাড়াও রয়েছে আরো অনেক কণা । একটি মানুষ সৃষ্টির নেপথ্যেও রয়েছে লক্ষকোটি কণার সমন্বয় । এই কণাদের জগৎটাও বড় বিচিত্র আর রহস্যময় ! এর কুহেলিভরা চরিত্র মোহিত করে রেখেছে গবেষকদের । আসলে এই কণাগুলির চরিত্রের গভীরেই লুকিয়ে রয়েছে মহাবিশ্বের সৃষ্টি রহস্যের চাবিকাটি । প্রচলিত থিওরি মতে এক মহাবিস্ফোরণের মাধ্যমেই এই মহাবিশ্বের জন্ম হয়েছিল যাকে ‘বিগ ব্যাং’ বলা হয়ে থাকে । এই বিস্ফোরণের পর ‘ম্যাটার’ (বা ‘পদার্থ’) আর ‘অ্যান্টিম্যাটার’ (বা ‘বিপরীত পদার্থ’) দু’টিই তৈরী হয়েছিল । কিন্তু অজ্ঞাত কারণে বর্তমান বিশ্ব ‘ম্যাটার’ দিয়েই তৈরী, আর আশ্চর্যজনকভাবে ‘অ্যান্টিম্যাটার’ অনুপস্থিত । যদি কখনো ‘ম্যাটার’ আর ‘অ্যান্টিম্যাটার’ এর মিলন হয় তখন বিস্ফোরণ হয়ে বিপুল পরিমানের শক্তি সৃষ্টি হয় । মজার ব্যাপার হল অ্যান্টিম্যাটারের অনুপস্থিতির জন্য আমরাও বহাল তবিয়তে রয়েছি এই ব্রহ্মান্ডে । এই অ্যান্টিম্যাটারের অস্তিত্বের কথা ১৯৩১ সালে সর্বপ্রথম পল ডিরাক নামক এক বিজ্ঞানী অনুমান করেছিলেন । সুদীর্ঘ ৬৯ বছর পর অ্যান্টিম্যাটারের পরীক্ষামূলক উপস্থিতি বিজ্ঞানীদের হিসেব নিকেশ অনেক পাকা করলো । বলা যায় মহাবিশ্বের রহস্য উন্মোচনে এটি এক ধাপ এগনো । ‘এল এইচ সি’ নির্মাণের এক গুরূত্বপূর্ণ উদ্দেশ্য ছিল ল্যাবরেটরিতে অ্যান্টিম্যাটার সৃষ্টি করা । কারণ এর অধ্যয়ন এতদিন তত্বের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল । আর পরীক্ষামূলকভাবে ল্যাবরেটরিতে এর সৃষ্টি করা এতদিন অধুরাই ছিল । কিন্তু বিজ্ঞানের জাদুতে অসম্ভবের সীমা অতিক্রম করে সম্ভবের মাইলস্টোন স্পর্শ ‘এল এইচ সি’ এর দৌলতেই অবশেষে সম্ভব হল । ডঃ জি বি অ্যান্ড্রিসেনের তত্বাবধানে ৪১ জন বিজ্ঞানীদের দল ‘এল এইচ সি’ তে ‘অ্যান্টিহাইড্রোজেন’ সৃষ্টি করলেন যার আয়ুকাল ছিল ১৭০ মিলি সেকেন্ড । ‘হাইড্রোজেন’ মৌলের ঠিক বিপরীত চরিত্রের অধিকারী এই ‘অ্যান্টিহাইড্রোজেন’ । খুব স্বল্প সময়ের জন্য একে সৃষ্টি করা হলেও এর আবির্ভাবে কিন্তু অনেক তত্বের প্রতিষ্ঠা পাকাপোক্ত হল । বিজ্ঞানীদের মতে এই অ্যান্টিম্যাটারের পরীক্ষামূলক অধ্যয়ন করে অনেক গুরূত্বপূর্ণ তথ্য জানাও ভবিষ্যতে সম্ভব হবে । মহাবিশ্বের জন্ম রহস্যের কুহেলিও ধীরে ধীরে আমাদের সামনে পরিস্কার হবে । তবে এর জন্য ‘এল এইচ সি’ এর অশ্বমেধ ঘোড়াকে অনেকদূর এগিয়ে যেতে হবে ।
          “আচ্ছা মশাই, ‘অ্যান্টি ইউনিভার্স’ থেকে আমার ‘বিপরীত সত্তা’ যদি আপনাদের সেই বিশাল যন্ত্রের সাহায্যে এই বিশ্বে চলে আসে তাহলে তো মুশকিল । কোথাও ওর সঙ্গে দেখা হবার পর করমর্দন হয়ে গেলে তো আমার অস্তিত্বই থাকবেনা” – বক্তা আমার বাড়ির মালিক । ‘ম্যাটার’ আর ‘অ্যান্টিম্যাটার’ এর মিলন হলে যে কি হবে সেই গূঢ় তত্ব তাহলে তিনি মিডিয়ার দৌলতে ভালই উপলব্ধি করতে পেরেছেন !

Wednesday, September 29, 2010

মোবাইল আতঙ্ক ভিত্তিহীন


“অনুগ্রহ করে ৯৮৮৮৩০৮০০১, ৯৩১৬০৪৮১২১, ৯৮৭৬২৬৬২১১, ৯৮৮৮৮৫৪১৩৭ এবং ৯৮৭৬৭১৫৫৮৭ মোবাইল নাম্বারগুলো থেকে কোন ফোন আসলে ধরবেন না । নাম্বারগুলো সেলফোনে আসলে লাল হয়ে যায় । উচ্চ কম্পনাঙ্কের এই ফোন কল গুলো ধরলে মস্তিষ্কক্ষরণ হতে পারে । ২৭জন মানুষের ইতিমধ্যে মৃত্যু হয়ে গেছে । বিস্তারিত জানার জন্য ডিডি নিউজ, আজতক চ্যানেলে চোখ রাখুন” ।
     আজব এই এস এম এসটি আমার সেলফোনে আসার পর অন্য ফালতু ম্যাসেজের মতই সে মোবাইলের এক বটনের চাপে ‘ডিলিট’ হয়ে গেল । কিন্তু চমক বাকি ছিল ! এই ‘সন্দেশ’-টি যে অনেকের বদহজম হয়েছে তা মিডিয়ার দৌলতে জানতে আর দেরি হয়নি । গুজব আর আতঙ্কের ককটেলে যে এই ‘সন্দেশ’ খবরের শিরোনাম হয়ে যেতে পারে তা বোঝা যায় নি, বা এই মুছে যাওয়া সন্দেশকে নিয়ে যে কলম ধরতে হবে তাও স্বপ্নে ভাবিনি । নিছক একটি ম্যাসেজ, সমস্যা জর্জরিত উত্তরপূর্বে আতঙ্কের নবতম সংযোজন । অলিক আতঙ্কের এই ম্যাসেজ পুজোর আগে আমজনতার কাছে পুজোর চাঁদার থেকেও ভয়ঙ্কর এক জুজু হয়ে ধরা দিয়েছে ।
     বিশ্লেষণে যাবার আগে বলে নেওয়া ভাল যে কোন অপ্রত্যাশিত ফোন কল থেকে মস্তিষ্কক্ষরণ বা মোবাইল ফোনের ব্যাটারি বিস্ফোরণ হবার কোন সম্ভাবনা নেই । আর এটা বিজ্ঞানসম্মত সত্য । 
     মোবাইল ফোনে যখন দুজন ব্যক্তি কথা বলেন তখন উচ্চ কম্পনাঙ্কের (৮০০-১০০০ মেগাহার্জ) বিদ্যুৎচুম্বকীয় তরঙ্গের জাদুতেই সেটা সম্ভব হয়, যাকে ‘বাহক তরংগ’ ও বলা হয়ে থাকে । আমাদের কথাবার্তার তরঙ্গকে এই বাহক তরঙ্গ এক মোবাইল ফোন থেকে আর এক ফোনে বহন করে নিয়ে যায় । মানুষের শ্রাব্যতীব্রতা মাপার জন্য একটি একক ব্যবহার করা হয় যাকে ‘ডেসিবেল’ বলা হয় যা শব্দচাপের একক । সাধারণতঃ দু’জন মানুষ যখন কথা বলেন তখন তীব্রতা প্রায় ৬০ থেকে ৬৫ ডেসিবেল হয় । বিজ্ঞানীদের মতে মানুষের সাধারণ শ্রাব্যসীমা হল প্রায় ৮৫ ডেসিবেল । এর থেকে বেশী হলে মানুষের বধির হবার আশঙ্কা থাকে । এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে বজ্রপাতের শব্দ প্রায় ১২০ ডেসিবেল হয়ে থাকে । মোবাইল কোম্পানীদের জন্য সরকারী তরফ থেকে একটা সীমা নির্ধারণ করা থাকে যা কোনমতেই ৮৫ ডেসিবেলের বেশী হতে পারবেনা । তার মানে কোন ক্ষতিকারক উচ্চ কম্পনাঙ্কের তরঙ্গ আমাদের মোবাইল সেটে এসে পৌছাতে পারবেনা । মোদ্দা কথায় মস্তিষ্কক্ষরণের কোন আশঙ্কাই নেই । তাই যে কোন নাম্বার থেকেই ফোন কল আসুক না কেন সেই কল থেকে অন্ততঃ হার্টের সমস্যা, কান দিয়ে রক্ত বের হওয়া ইত্যাদি আজব ঘটনা ঘটার বাস্তব কোন কারণ নেই । আর এটা বিজ্ঞানসম্মত সত্য । 
     মোবাইল বিস্ফোরণ নিয়ে গুজব বর্তমানে চরমে । মোবাইলের ব্যাটারি কখনো কখনো বিস্ফোরণ ঘটাতে পারে তবে তা কখনো বৃহদাকারে হয়না । নানা কারনে সেটা হতে পারে । ২০০৬ সালে নোকিয়া কোম্পানীর ‘বি এল ৫ সি’ সিরিজের ব্যাটারিতে সমস্যা দেখা গিয়েছিল । ভারতের নানা প্রান্ত থেকে মৃদু বিস্ফোরণের খবরও শুনা যাচ্ছিল । যাই হোক সেই সমস্যা কোম্পানী অচিরেই সমাধান করতে পেরেছিল । টেকনোলজি এক্সপার্টদের মতে কখনো কখনো ব্যাটারি খুব বেশী চার্জিং করলে, অথবা পুরানো ব্যাটারি থেকেও মৃদু বিস্ফোরণ হতে পারে । তবে সেই বিস্ফোরণে ক্ষতির সম্ভাবনা খুব কম । আর কোন ফোনকলের মাধ্যমে মোবাইল বিস্ফোরণ ঘটানো অসম্ভব । 
     এবার আসি মোবাইল ভাইরাস প্রসঙ্গে । ‘মোবাইল ভাইরাস’ হল এক উন্নতমানের প্রোগ্রাম যে নিজে রক্তবীজের মত বংশবৃদ্ধি করে মোবাইলের সফটয়ারের প্রভূত ক্ষতিসাধন করতে পারে । মানুষ যেমন মোবাইল সৃষ্টি করেছে ঠিক তেমনি মোবাইল ভাইরাস সৃষ্টির পুরো কৃতিত্বও কিন্তু কিছু অপরাধপ্রবন মানুষেরই । এই ভাইরাস মোবাইলকে বিকল করে দিতে পারে । মূলতঃ ‘ব্লু টুথ’ এর সাহায্যে গান এবং ভিডিও ডাউনলোড করার সময় ভাইরাসগুলি এক মোবাইল থেকে অন্য মোবাইলে ছড়িয়ে পড়ে । পাশাপাশি ইন্টারনেট থেকেও ছড়িয়ে পড়তে পারে ভাইরাস । সাম্প্রতিক কিছু ঘটনাতে দেখা গেছে যে কিছু মোবাইল লাল হয়ে গেছে, অথবা নানা আজব নাম্বার মোবাইলের স্ক্রিনে চলে আসছে, এর পেছনেও কিন্তু ভাইরাসের নেপথ্য ভূমিকা অস্বীকার করা যায় না । তবে কোন ভাইরাস মোবাইলের বিস্ফোরণ অথবা আমাদের দৈহিক অসুস্থতার জন্য কোন ভাবেই দায়ী নয় ! 
     এই সরল মোবাইল সন্দেশটির জন্ম ২০০৭ সালে । আঁতুরঘর - পাকিস্থান । সেখান থেকে আতঙ্কের এই এস এম এস আফগানিস্থানেও আলোড়ন তুলে । গুজবের বিষাক্ত ঝড়ে সেখানের জনজীবন স্তব্ধ হয়ে পড়ে । ‘মোবাইল বিজনেস ম্যাগাজিন’ এর তথ্যমতে পাকিস্থান ও আফগানিস্থান সরকারের তরফ থেকে জনসাধারণের উদ্দেশ্যে গুজব নিয়ে আতঙ্কিত না হবার কথা প্রচার করা হয় । আফগান টেলিভিশনে সরকারী আধিকারীকেরা সম্ভাব্য গুজব নিয়ে বিজ্ঞানসম্মত যুক্তি জনসাধারণের সম্মুখে তুলে ধরেন । ৭ এপ্রিল ২০০৭ সালে এই এস এম এস কেসের নেপথ্য চার অপরাধীদের ধরা হয় । এই ‘সন্দেশ’ যে বর্তমানে উত্তরপূর্ব ভারতেই ঝড় তুলেছে এমন নয়, বিশ্বের নানা দেশেও তা ছড়িয়ে পড়েছে । সম্প্রতি সুদান, কেনিয়াতেও চলছে গুজবের রাজত্ব । সে দেশের সরকারের যোগাযোগ মন্ত্রকের তরফ থেকেও গুজবে কান না দেবার কথা বহুলভাবে প্রচার করা হয়েছে । সবথেকে মজার ব্যাপার হল আমাদের এখানের মোবাইলে যে ম্যাসেজ এসেছে তা ২০০৭ সালের ম্যাসেজটির হুবহু নকল । শুধু স্থানকাল ভেদে নিউজ চ্যানেলের নাম পরিবর্তিত হয়েছে । সেই ম্যাসেজেও ২৭জন মানুষের মৃত্যুর কথা বলা হয়েছিল । আর ম্যাসেজের ৫ টি নম্বরও অপরিবর্তিত । ম্যাসেজ একই, কিন্তু এখন সে দেশের সীমা অতিক্রম করেছে । এই প্রবন্ধ লেখার কারণে নানা মোবাইল ফোন পরিষেবা বিতরণকারীদের সঙ্গে ই-মেলে যোগাযোগ করা হলে তারাও সবাই এই গুজবে কান না দেবার কথা বলেছেন । আসলে এই ভুয়ো ম্যাসেজের বাড়বাড়ন্ত রুখতে আমাদের সম্মিলিত প্রয়াস দরকার ।
     মোবাইল ফোনের ক্ষতিকারক প্রভাব নিয়েও সারা বিশ্বে গবেষনা হচ্ছে । তবে তা মূলতঃ দীর্ঘসময় সেলফোন ব্যবহার কেন্দ্রিক । ২০০৫ সালে গবেষক এস লোন আর তার সহযোগীরা আমেরিকান জার্নাল অফ এপিডেমিওলোজিতে একটি গবেষণাপত্র প্রকাশ করেন । গবেষণার বিষয়বস্তু ছিল ‘লং টার্ম মোবাইল ফোন ইউস এন্ড ব্রেইন টিউমার রিস্ক’ । দেখা গেছে, যারা খুব বেশী মোবাইল ফোন ব্যবহার করেন তাদের ব্রেন টিউমার হবার সম্ভাবনাও বেড়ে যায় । এ ছাড়া আরো ভয়ঙ্কর কথা শুনিয়েছেন বিজ্ঞানীরা । পুরুষদের প্রজনন ক্ষমতা হ্রাস পাবার সম্ভাবনাও বাড়ছে – ২০০৭ এ প্রকাশিত একটি গবেষনণাপত্রে এমনই আশঙ্কা করেছেন আর্থার ডোইয়াক আর তার সহযোগীরা । এছাড়া আরো অনেক অপকারিতার খবরও লুকিয়ে রয়েছে মোবাইল ফোনের ব্যবহারে । তবে এসব ক্ষেত্রে অনেকদিন ফোন ব্যবহার করলেই এই দুর্ভোগ দেখা দিতে পারে । তবে তাৎক্ষণিক ক্ষতির কথা বিজ্ঞানীরা একযোগে অস্বীকার করেছেন ।
     শেষ পাতে পরিবেশন ! গত তিনদিন আগে আমার মোবাইলে এক অজানা ফোন কল আসার সঙ্গে সঙ্গে আমার মা আতঙ্কগ্রস্থ হয়ে পড়েন । নাম্বারটি দেখে ‘ল্যান্ডলাইন নাম্বার’ বলে মা-কে আশ্বস্ত করলাম । অপরপ্রান্ত থেকে আমার এক ঘনিষ্ট বন্ধুর পরিচিত কন্ঠস্বর –‘এখনই সেল স্যুইচ অফ কর । শুনিসনি যে কোন সময় অজানা ফোনকল এসে সেলফোনের বিস্ফোরণ ঘটাতে পারে । আমাদের পাড়াতে ঘোষণা হয়ে গেছে । সবার সেল স্যুইচ অফ । তোর ফোন তো এখন তাজা বোমা’ । মা-কে কথোপকথনের রিপোর্ট দিলাম না । টেবিলের উপর চুপচাপ শুয়ে থাকা তাজা বোমাটির উপর চোখ পড়লো । সে নীরবে শুয়ে আছে, আর তাকে নিয়েই চলছে সারা বিশ্বে নানা খেলা !

Tuesday, August 24, 2010

চাঁদের আকার দিন দিন সঙ্কুচিত হচ্ছে, দাবি নাসার বিজ্ঞানীদের




চাঁদ নিয়ে জবর খবর তাদেরকে রাতারাতি ‘তারকা’ বানিয়ে দিল ! ‘সায়েন্স’ জার্নালে গত ২০শে আগষ্ট, ২০১০ গবেষণাপত্রটি বের হবার পর বিজ্ঞানীমহলে আলোড়ন তুললেন থমাস ওয়াটার্স আর তার সহযোগীরা । চাঁদের ব্যাসার্দ্ধ নাকি গত ১০ কোটি বছরে ১০০ মিটার কমেছে, আর ভবিষ্যতে সেটা আরো কমবে ।
    আমাদের পৃথিবীর অতি আদরের উপগ্রহ নিয়ে বিজ্ঞানীর পাশাপাশি সাধারণ মানুষেরও আগ্রহের সীমা নেই । সাহিত্য, ধর্ম, সংস্কৃতি সর্বত্রই তাঁর অবাধ গতি । শিশুকে যেমন চাঁদের মায়াময় রূপ দেখিয়ে মন ভুলানো যায়, তেমনি আবালবৃদ্ধবনিতাও তার নির্মল আলোর যাদুতে মোহিত হয়ে যান । রাতের আকাশে তার উপস্থিতি পরিবেশকে এক আলাদা পবিত্রতায় নিয়ে যায় । উপকথা আর রূপকথার জগতে কখনো শুনা যায় ‘চাঁদের বুড়ির’ কথা যে নাকি অবিরত চরকা কেটে যাচ্ছে । এই চাঁদই কবিদের চোখে কখনো ঝলসানো রুটি আবার কখনো আঁধার প্রেমের সাক্ষী ।    
    চাঁদের মাটিতে ১৯৬৯  সালে পদার্পন করার পর ইতিহাস গড়েছিলেন নীল আর্মষ্ট্রং আর তার সহযোগীরা । যা আগে শুধু স্বপ্ন ছিল সেই চরম সত্যকে বিজ্ঞানের ভেলকিতে বাস্তব করে দেখালেন বিজ্ঞানীরা । তারপর হয়েছে চাঁদ নিয়ে নানা অভিনব আবিষ্কার । ভারতের জন্যও শ্লাঘার ব্যাপার যে ‘ইসরো’ প্রেরিত কৃত্রিম উপগ্রহ ‘চন্দ্রযান-১’ মিশনও সাফল্যের মুখ দেখে । ২০০৯ সালে চাঁদের দক্ষিণ মেরুতে জলের উপস্থিতির কথা সর্বপ্রথম ভারতের বিজ্ঞানীরাই বিশ্বের দরবারে তুলে ধরেন । তারপর নাসা ৯ অক্টোবর, ২০০৯ পরীক্ষামূলক ভাবে দক্ষিণ মেরুতে দ্রবীভূত জলের সন্ধান পায় । সাম্প্রতিক এই দুরন্ত আবিষ্কারের নেপথ্য নায়ক কিন্তু ‘নাসা’ প্রেরিত ‘লুনার রিকনেশাঁ অরবিটার’  যা গত ১৮ জুন, ২০০৯ এ উৎক্ষেপণ করা হয়েছিল ।
চন্দ্র পৃষ্ঠের এই চ্যুতি গুলোর ফটো বিশ্লেষণ করেই নাসার বিজ্ঞানীরা চন্দ্রের সঙ্কুচিত হবার খবরটি প্রকাশ করেছেন ।    

    থমাস ওয়াটার্স আর তার সহযোগীরা ‘লুনার রিকনেশাঁ অরবিটার ক্যামেরা’ দিয়ে চন্দ্র পৃষ্ঠের তোলা ফটো গুলোর পুঙ্কানুপুঙ্ক বিশ্লেষণ করে এই লক্ষ্যে পৌছেছেন যে চাঁদের আকার সঙ্কুচিত হয়েছে । এই সঙ্কুচনের হার গত দশ কোটি বছরে ১০০ মিটার ! আগামিতেও চাঁদের ব্যাসার্দ্ধ কমার আশঙ্কা আছে । নাসার ‘লুনার রিকনেশাঁ অরবিটার’ মিশনের মূল উদ্দেশ্য হল চন্দ্রপৃষ্টের গঠন নিয়ে বিস্তারিত অধ্যয়ন করা । আসলে ১৯৭০ সালের প্রাক্কাল থেকেই ‘অ্যাপেলো ১৫, ১৬ এবং ১৭’ মহাকাশযানগুলো চন্দ্রের খুব কাছ থেকে ফটো তুলে পৃথিবীতে পাঠাতে শুরু করে । তখন চাঁদের বিষুবরেখার বরাবর অনেক চ্যুতি বিজ্ঞানীদের নজরে আসে । এই চ্যুতিগুলো দেখতে কিছুটা ফাটলের মত । বিজ্ঞানের ভাষায় একে ‘লোবেট স্কার্পস’ বলা হয় । “অ্যাপেলো মিশনের মূল উদ্দেশ্য ছিল চাঁদের মাটিতে মানুষ অবতরণ করানো, তাই অ্যাপেলোর পাঠানো ছবিগুলো মূলতঃ বিষুবরেখা কেন্দ্রিক ছিল” । বক্তা আমেরিকার ওয়াশিংটনের সেন্টার ফর আর্থ এন্ড প্ল্যানেটারি স্টাডিসের বিজ্ঞানী থমাস ওয়াটার্স যিনি এই প্রজেক্টের সঙ্গে ওতোপ্রোতভাবে যুক্ত । “বর্তমান মিশনে আমরা চাঁদের বিষুবরেখা ছাড়া উচ্চ অক্ষাংশেও চ্যুতির সন্ধান পেয়েছি । সেটা সম্ভব হয়েছে আল্ট্রা উচ্চপ্রযুক্তির ক্যামেরা ফটোগ্রাফি থেকে” । ‘লুনার রিকনেশাঁ অরবিটার ক্যামেরা’  এর সাহায্যে চৌদ্দটি ‘লোবেট স্কার্পস’ এর সন্ধান পাওয়া গেছে যার মধ্যে সাতটি ৬০ ডিগ্রি অক্ষাংশে পাওয়া গেছে । এর থেকে বোঝা যায় যে এই চ্যুতিগুলো চাঁদের সবদিকেই ছেয়ে আছে । আশা করা যায় যে আগামীতে তেমন আরো অসংখ্য ‘স্কার্পস’ এর সন্ধান পাওয়া যাবে ।       
    চাঁদের পৃষ্টে এই ‘লোবেট স্কার্পস’ হবার কারণটাই বা কি ? আর এর সঙ্গে সঙ্কুচনের কি সম্পর্ক ? বিজ্ঞানীদের মতে চন্দ্র যখন সৃষ্টি হয়েছিল তখন সে খুব গরম আর গলিত অবস্থায় ছিল । চাঁদের অভ্যন্তর ধীরে ধীরে ঠান্ডা হওয়ার জন্য তার আকার কমতে থাকে, আর এর প্রভাব পড়ে বহির্পৃষ্টে । আভ্যন্তরীণ আকার কমার দরুণ বহির্পৃষ্টে তখন চ্যুতির সৃষ্টি হয় । এই চ্যুতিগুলোর অধ্যয়ন করে সঙ্কুচনের হার হিসেব করে বের করা যায় । এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে বুধ আর মঙ্গলগ্রহেও এই চ্যুতি দেখা গেছে যা কয়েক হাজার কিলোমিটার পর্যন্ত বিস্তারিত হয় । আর চাঁদের ক্ষেত্রে তা কয়েক কিলোমিটার পর্যন্ত হয় ।    
    আগামী ১৮ সেপ্টেম্বর ‘আন্তর্জাতিক চন্দ্রদর্শন রাত্রি’ হিসেবে উদযাপন করা হবে সারা বিশ্বে । মূলতঃ চন্দ্রবিজ্ঞান আর এর আবিষ্কারের কথা জনসমক্ষে তুলে ধরার জন্য বিজ্ঞানীদের তরফ থেকে এই আয়োজন । সবথেকে মজার ব্যাপার হল ছোট দূরবীক্ষণ যন্ত্রের সাহায্যেও চাঁদের সুন্দর পাহাড় বা গহবর গুলো খুব ভালো দেখা যায় । তাই বিশ্বের নানা স্থানে ঐ বিশেষ রাত্রে  চন্দ্রদর্শনের আয়োজন করা হবে ।
    এই রাত্রিটা অন্যান্য রাত্রির থেকে সম্পূর্ণ আলাদা । এক আলাদা আমেজ, একটু রোমান্টিক ভাবনা, আর ...বিজ্ঞান - সবই আছে । তাই ব্যস্ততার ফাকে একটু রোমান্টিক হয়ে উঠতে কে না চায় !!!

Friday, August 13, 2010

মহাপ্রলয়ের নেপথ্যে



চিত্র ১ -  কাউন্টডাউন শুরু ! ২০১২ সালেই কি তাহলে পৃথিবীর চুম্বকীয় মেরু পরিবর্ত্তিত হওয়া পাকা ?
চিত্র ২ - কম্পাস প্রস্তুতকারী কোম্পানীগুলো কম্পাসের উত্তরকে দক্ষিণ আর দক্ষিণকে উত্তর বানাবার চিন্তা ভাবনা করছে !
চিত্র ৩ - নস্ত্রাদামুসের ভবিষ্যত গণনায় বিশ্বাসীরা আসন্ন প্রলয়ের চিন্তায় বিভোর !
চিত্র ৪ - পৃথিবীর চুম্বকীয় ক্ষেত্র বা ম্যাগনেটিক ফিল্ডের হঠাৎ পরিবর্তন জীবজগতে কি প্রভাব ফেলবে - এ নিয়ে জম্পেশ গবেষণা করার খোরাকও পেয়ে গেলেন কিছু গবেষক !
চিত্র ৫ - পরিবেশ বিজ্ঞানীরা আসন্ন বিপদের কথা ভাবছেন ! মহাজাগতিক রশ্মি কিছু সময়ের জন্য কোনও বাধা না পেয়ে পৃথিবীতে পতিত হলে জীবজগতের কী ক্ষতি হতে পারে সেটা নিয়েই বিশ্লেষণ চলছে !
চিত্র ৬ - হলিউডের ব্লকব্লাস্টার ফিল্ম '২০১২' গত ১৩ নভেম্বর, ২০০৯ তারিখে মুক্তি পেয়েছে । মুভিটি সারা বিশ্বে হিট !

              ২১ ডিসেম্বর ২০১২ । ঠিক এই তারিখেই ঘটতে চলেছে মহাপ্রলয় ! ২০০২ সালে প্রকাশিত 'দি অরিয়ন প্রোফেসি' নামক বইয়ে জনৈক বেলজিয়ামের লেখক পেট্রিক গেরিল-এর অন্তত এমনটিই দাবি । আর তিনি তাঁর এই দাবিকে পাকাপোক্ত করার জন্য  বিজ্ঞান আর মাইথোলজির আশ্রয় নিয়েছেন ; নিট ফল - বইটি বেস্টসেলিং -এর তালিকায় । এর তিন বছর পর ওই লেখকের আরও একটি বই বের হয় - 'দি ওয়ার্ল্ড কেটাক্লিসম ইন ২০১২' । বলাবাহুল্য এই বইটিও বাজার মাত করেছিল । এরই মধ্যে তৈরী হয়েছে 'হাউ টু সারভাইভ ২০১২ ডট কম' নামে একটি ওয়েবসাইট । সেখানেই বর্ণনা আছে শেষের সেই ভয়ঙ্কর দিনের কথা , আর মহাপ্রলয়ের হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার নানা উপায় । ওয়েবসাইটের বয়ান থেকে এটা পরিষ্কার যে মোটা অঙ্কের টাকা খরচ করেই টিকে থাকতে হবে এই গ্রহে ।

            মাইথোলজি কী বলছে ? পেট্রিক গেরিল মায়া সভ্যতা আর মিশরীয় সভ্যতার পুরনো নথিপত্র ঘেটে বলতে চেয়েছেন যে ২১ ডিসেম্বর , ২০১২ তেই নাকি নেমে আসছে শেষের সেই দিন ! তার এই দাবিকে জোরালো করার জন্য ওই সভ্যতার আগের মিলে যাওয়া কিছু ভবিষ্যত গণনার কথাও উল্লেখ করা হয় বইটিতে । 'মেসোআমেরিকান লং কাউন্ট ক্যালেন্ডার' - এ নাকি ২১ ডিসেম্বর , ২০১২ - এর পর তারিখ সমাপ্ত । মানে পৃথিবী ধবংস !

          বিজ্ঞানীরা কী বলছেন ? 'মেসোয়ামেরিকান লং কাউন্ট ক্যালেন্ডার' কে বিজ্ঞানীমহল বাতিলের খাতায় ফেলে দিয়েছেন । মায়া সভ্যতার কিছু মানুষ এক ভুল সত্যের পেছনে ছুটেছিলেন , এ নিয়ে বিজ্ঞানীদের মনে কোনও সন্দেহ নেই । সেই সভ্যতা নিঃসন্দেহে উন্নতমানের ছিল কিন্তু এর মানেই এই নয় যে ওদের সব ধারণাই সঠিক ছিল ।

         টিভি অথবা খবরের কাগজে ক'বছর পরপর 'মহাপ্রলয়' নিয়ে নানা চমকপ্রদ খবর বের হয় ! সাইবার জগতেও এর ব্যাপ্তি বিশাল । ইন্টারনেটের হাজার হাজার অয়েবসাইটেও রয়েছে মহাপ্রলয় নিয়ে অবিশ্বাস্য কথা ! এর সত্য মিথ্যা যাচাই করাটাও অনেকসময় কঠিন হয় । কারণ ঐ ধারণাগুলি বিজ্ঞানের প্যাকিং দিয়ে এমনভাবে মোড়া হয় যে আসল সত্য ভিতরেই থেকে যায় ।

         নিজেকে একজন গবেষক বলে জাহির করা পেট্রিক গেরিল বিজ্ঞানের আশ্রয়ও নিয়েছেন সুচতুরভাবে । তার বই এ 'জিওম্যাগনেটিক রিভারসেল' তত্ত্বের প্রসঙ্গ জোরালোভাবে পেশ করা হয়েছে ।

          এবার একটু বোঝার চেষ্টা করা যাক 'জিওম্যাগনেটিক রিভারসেল' বা 'ভূচুম্বকীয় বিপরীতীকরণ' তত্ত্বটা আসলে কি ? একটা চুম্বকের বাটকে যদি শূন্যে সুতো দিয়ে ঝুলিয়ে দেওয়া যায় তবে দেখা যায় যে সেটা সবসময় পৃথিবীর উত্তর-দক্ষিণ মেরু বরাবর অনুভূমিক ভাবে অবস্থান করে । আসলে পৃথিবী নিজেই একটা বিশাল চুম্বক । চুম্বকের বিশেষত্ব হল এর উত্তর মেরু আর দক্ষিণ মেরু । পৃথিবীর ক্ষেত্রে ওর ভৌগলিক উত্তর গোলার্ধেই রয়েছে চুম্বকীয় উত্তর মেরুর অবস্থান, আর দক্ষিণ গোলার্ধে রয়েছে চুম্বকীয় দক্ষিণ মেরুর অবস্থান । এই ব্যাপারটাকে কাজে লাগিয়েই তৈরী হয়েছে কম্পাস । আর দিক নির্ণয়ের কাজে কম্পাসের কোন বিকল্প নেই । কিন্তু মজার ব্যাপার হল এই মেরুগুলোও টেনিস খেলোয়ারের মত একটা 'সেট' শেষ হলে দিক পরিবর্তন করে । তখন ভৌগলিক উত্তর গোলার্ধে হয়ে যায় চুম্বকীয় দক্ষিণ মেরু, আর দক্ষিণ গোলার্ধে চুম্বকীয় উত্তর মেরু । এই পরিঘটনাকেই 'ভূচুম্বকীয় বিপরীতীকরণ' বলা হয় । এই বিপরীতীকরণ হতে সময় লাগে কয়েক হাজার বছর । পৃথিবীর ক্ষেত্রে এর কোন বাধাধরা নিয়ম নেই । কখনো ৫০ হাজার বছরেও মেরু বিপরীতীকরণ হয় আবার কখনো এর থেকে বেশী সময়ও লাগে । যেমন পৃথিবীর শেষ মেরু বিপরীতীকরণ হয়েছিল প্রায় ৭ লক্ষ ৮০ হাজার বছ আগে । এর পরেরটা কবে হবে সেটা বলা একটু কষ্টকর । এখানে উল্লেখ্য যে সূর্যের মেরু বিপরীতীকরণ হতে সময় লাগে মাত্র ১১ বছর । আর এই সময়টাও প্রায় অপরিবর্তিত থাকে । ২০০১ সালে সূর্যের এই বিপরীতীকরণ হয়েছিল । আগামী ২০১২ সালে আবার সেই বিপরীতীকরণ হওয়াটাও পাকা । 

        আবার চলে আসি পেট্রিক গেরিল প্রসঙ্গে । ওনার মস্তিষ্ক থেকে জন্ম নেওয়া নুতন থিওরি মতে যেহেতু সূর্যের চুম্বকীয় মেরু বিপরীতীকরণ আগামী ২০১২ সালে, তাই সেটার প্রভাবও এসে পড়বে পৃথিবীর উপরে । পৃথিবীতেও তখন মেরু বিপরীতীকরণের হাওয়া লাগবে । আর এর ফলে ভূমিকম্প, সুনামি শুরু হয়ে যাবে এই গ্রহে - ধ্বংস হয়ে যাবে পৃথিবী । 

         থিওরিটা কতটুকু যুক্তিযুক্ত ? নাসার বিজ্ঞানীদের মতে সূর্যের চুম্বকীয় মেরু পরিবর্তনের সঙ্গে পৃথিবীর মেরু বিপরীতীকরণের কোন সম্পর্ক নেই । সেটা বিজ্ঞানসম্মত সত্য । পৃথিবীর ক্ষেত্রে সেই বিপরীতীকরণটা কবে হবে সেটা বলা মুশকিল । তবে সেটা যে আগামী কয়েক বছরে হবেনা এ ব্যাপারে বিজ্ঞানীরা একমত । যদি ভূচুম্বকীয় বিপরীতীকরণ হয় তবে পৃথিবীতে কি অনাসৃষ্টি হতে পারে ? আসলে পৃথিবীর চুম্বকীয় ক্ষেত্র সূর্য থেকে আসা ক্ষতিকারক রশ্মিকে পৃথিবীতে আসতে বাধাদান করে । এর ফলেই জীবজগত ঐ ক্ষতিকারক রশ্মি থেকে সুরক্ষিত আছে । মেরু  বিপরীতীকরণের সময় সামগ্রিক কিছু সময়ের জন্য পৃথিবীর চুম্বকীয় ক্ষেত্র কমে যেতে পারে । আর এর ফলে ক্ষতিকারক রশ্মি পৃথিবীতে এসে ঢুকবে । তবে  বিজ্ঞানীরা অভয় দিয়ে বলেছেন যে এর ফলে মারাত্মক কোন ক্ষতি হবেনা । কারণ এর আগেও পৃথিবীতে এমন ঘটনা ঘটেছে, কিন্তু জীবকুল বিলুপ্ত হয়ে যায়নি । আর মেরু  বিপরীতীকরণের জন্য ভূমিকম্প বা সুনামির মত ঘটনা ঘটবে এর কোন যুক্তিসঙ্গত কারণ নেই । 

              রোলান্ড এমেরিক পরিচালিত ২০০ মিলিয়ন ডলার বাজেটের হলিউড মুভি '২০১২' গত ১৩ নভেম্বর ২০০৯ এ মুক্তি পেয়েছে । এই মুভি মহাপ্রলয়ের থিম নিয়েই তৈরী হয়েছে । মুভিটি সারা বিশ্বে হিট । আর  পরিচালক যা ভবেছিলেন তাই হয়েছে । মহাপ্রলয়ের যুযু দেখিয়ে মুনাফা অর্জনের পথটাও হলিউডের জানা আছে । 

          ২১ নয়, ২২ ডিসেম্বর ২০১২ । সেদিন অবশ্যই একটা ই-মেল করবো - পেট্রিক গেরিলকে । আর বলবো যে ভাওতাবাজী দিয়ে ব্যবসায় করা যায়, কিন্তু   বিজ্ঞানের একনিষ্ঠ সাধক হওয়া যায় না । পাঠকদের জন্য ই-মেল ঠিকানা দিলাম, ইচ্ছে হলে আপনারাও মেল করতে পারেন - patrick.geryl@skynet.be